বাংলায় একটি কথা আছে, ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাবে’ কথাটার সরল অর্থ, তুমি যে কাজ করার জন্য অপরকে উপদেশ দেবে, সেই কাজটি আগে নিজে করবে। গত শুক্রবার ঢাকার মহানগর নাট্যমঞ্চে কৃষকবিহীন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের চতুর্থ জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই উপদেশটি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে। মির্জা ফখরুল পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদেরের। কেন করেছেন সে প্রশ্নে পরে আসছি।
আগেই বলেছি, ওবায়দুল কাদেরকে এই উপদেশটি দিতে হলে ফখরুল ইসলামকে আগে বিএনপির মহাসিচব পদে প্রবাদ বাক্য অনুসারে ইস্তফা দিতে হয়। নইলে এই ইস্তফাদানের দাবি জানানোর অধিকার তিনি লাভ করেন না। রাজনীতির শাস্ত্র অনুযায়ীও এই দাবি জানানোর অধিকার মির্জা ফখরুলের নেই। ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তার নাম এই পদে প্রস্তাব করেছিলেন আওয়ামী লীগের আগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সব কাউন্সিলর তাতে সম্মতি জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে মির্জা ফখরুল বিএনপির নির্বাচিত মহাসচিব নন। মহাসচিবের মৃত্যু হলে সভানেত্রী খালেদা জিয়া তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করেন। এই ন যযৌ ন তস্থোই অবস্থায় তিনি ত্রিশঙ্কু হয়ে এই ভারপ্রাপ্ত পদে বহুকাল ঝুলেছিলেন। বাজারে গুজব ছিল তিনি লন্ডন থেকে ওহি লাভের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেননি। এজন্যে দলের পক্ষে বহু সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে অপদস্ত হতে হয়েছে। আসমানি কিল (লন্ডন থেকে পাঠানো) খেয়ে কিল হুজম করতে হয়েছে। কখনো কখনো দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার মাথার ওপর ঝান্ডা উড়িয়েছে রিজভি অথবা গয়েশ্বর রায়। একটি রাজনৈতিক দলের মহাসচিব হওয়ার জন্য একজন নেতার যে ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে, তাও মির্জা ফখরুলের নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে তার পিতার ভূমিকাটি কি ছিল? এই ভূমিকার জন্য ঠাকুরগাঁওয়ের সাধারণ মানুষ তাকে কি সংবর্ধনা দিয়েছিল, তা তিনি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি? ভুলে যাননি বলেই তাকে বিএনপিতে যোগ দিতে হয়েছে। এখন যে তিনি বিএনপির মহাসচিব হয়েছেন এটা ভাগ্যচক্রের খেলা। তার নিজের কৃতিত্ব কিছু নেই।
বিএনপির সাবেক বামপন্থি মহাসচিবের মৃত্যুর পর বেগম জিয়া একজন কট্টর ডানপন্থি, যার পরিবারে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার গল্প আছে এমন ব্যক্তি খুঁজছিলেন এবং মির্জা ফখরুলকে এই উপযুক্ত পাত্র ভেবে সাময়িকভাবে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদে নিযুক্তি দেন। এই ভারপ্রাপ্ত বা ভারবাহী পদে মির্জা ফখরুলকে কাটাতে হয় দস্যু রত্নাকরের বনবাস-সাধনার মতো এক যুগ। ইন্দ্রপুরী (লন্ডন) থেকে ইন্দ্রদেবের (তারেক রহমানের) অনুমতি ও আশীর্বাদ না আসায় তাকে ভারবাহী অবস্থায় ঝুলে থাকতে হয় প্রায় এক যুগ।
তারপর তারেক রহমানের আশীর্বাদ লাভ করায় তার ভারবাহিত্ব ঘোচে। এই ভারবাহিত্ব ঘুচে যাওয়ার পরও তারেক রহমানের প্রতি আনুগত্য প্রমাণের জন্য তিনি আরেকটি কাজ করেন। ডা. বদরুদ্দোজা ছিলেন জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্ধু। বিএনপির তিনি প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। তাকে দলে সবাই সম্মান করে, একমাত্র তারেক রহমান ছাড়া। তারেক পিতৃবন্ধুদের কিছুমাত্র সম্মান করতে চান না। তিনি জামায়াতীদের দ্বারা প্রভাবিত। দলে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক নেতাদের রাখতে চান না। ডা. বি. চৌধুরী তার কোপে পড়েন। দলের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরেও তারেক রহমানের নির্দেশেই তাকে বঙ্গভবন থেকে অপমানজনকভাবে বহিষ্কার করা হয়। তিনি রাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।
গত সাধারণ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের জন্য ড. কামাল হোসেন, ডা. বি. চৌধুরী এবং আরো কয়েক জন নেতাকে নিজেদের জোটে টেনে আনে বিএনপি। কিন্তু ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে এই জোটে রাখার ইচ্ছা ছিল না তারেক রহমানের। তার গোপন নির্দেশে মির্জা ফখরুলেরা ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ডা. বদরুদ্দৌজার সঙ্গে লুকোচুরির খেলা খেলে তাকে বাদ দিয়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেন। দলের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিবকে এভাবে অপমানিত করতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। দলের মনোনীত বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল।
তিনি একটি ক্ষমতাসীন দলের তিন তিনটি সাধারণ নির্বাচন-বিজয়ী সাধারণ সম্পাদককে পদত্যাগের উপদেশ দিয়েছেন। আত্মসম্মানবোধ থাকলে তিন তিনটি সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত দলের মহাসচিব হিসাবে তার বহু আগে পদত্যাগ করা উচিত ছিল। দলের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তার নেই। তাকে লন্ডন থেকে ওহি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। হুকুম না মানলে পদ থাকবে না তিনি তা জানেন। আর পদে থাকতে না পারলে তার অবস্থা কী দাঁড়াবে ডা. বদরুদ্দৌজা, কর্নেল অলি প্রমুখ পূর্বসূরি বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের পরিণতি দেখে তিনি তা জানেন।
গত সাধারণ নির্বাচনে তার দল পরাজিত হওয়ার পর তিনি গর্জন করেছিলেন, তিনি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার গণআন্দোলন গড়ে তুলবেন। সেটা ছিল ফাঁকা আওয়াজ। খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হওয়ার পর তার গর্জন ছিল, জেলের তালা ভাঙবো, নেত্রীকে মুক্ত করবো। জেলের তালা ভাঙেনি। তারপর তাকে দেখা গেছে দলনেত্রীকে জামিনে মুক্ত করার জন্য ক্ষমতাসীনদের কাছে দেন দরবার করতে। ...তিনি আন্দোলন করবেন, ইস্যু নেই। এতদিন পর কাদের মির্জার কিছু আবোল-তাবোল বক্তব্যকে ইস্যু করে মাঠে নামতে চান।
কিন্তু এই কাদের মির্জা কে? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের তিনি ছোট ভাই। এছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে এতদিন সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিলেন। অখ্যাত ছিলেন। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার মেয়র জাতীয় ব্যক্তিত্ব হতে পারেন না দেশের গ্রামাঞ্চলে এমন ব্যক্তি বহু আছেন, যারা নানা কারণে সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য ছড়ান। তাদের বক্তব্য মিডিয়ায় গুরুত্ব পায় না। কারণ মিডিয়া তাদের গুরুত্ব দেয় না। কাদের মির্জার বক্তব্য এত গুরুত্ব পেয়েছে, তার কারণ, হাসিনা সরকারের প্রচণ্ড বিরোধী একটি ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিক তাকে গুরুত্ব দিয়েছে। জাতীয় নেতাদের মতো গুরুত্ব দিয়ে তার গুরুত্বহীন কথাগুলোকে রোজ পত্রিকার প্রথম পাতায় লিড নিউজ করেছে। কাদের মির্জাকে রাজনৈতিক অসত্ উদ্দেশ্য নিয়ে মিডিয়া হিরো করতে চেয়েছে। নিরপেক্ষ দৈনিকের দেখাদেখি আরো দুএকটি দৈনিকও কাদের মির্জার বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে। তা ওবায়দুল কাদেরকে কিছুটা বিব্রত করে থাকতে পারে। তাবে তা বিএনপির মৃতপ্রায় দেহে বড় যোগেশের কাজ করেছে। মির্জা ফখরুলেরা চোখ মেলে চেয়েছেন।
মির্জা ফখরুল কৃষক লীগের সভায় দাঁড়িয়ে ওবায়দুল কাদেরের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তিন তিনটি নির্বাচনে পরাজিত দলের নেতা, দলনেত্রীকে জেল থেকে মুক্ত করতে ব্যর্থ, বারবার গণআন্দোলনের ডাক দিয়ে ড্রয়িং রুমে আন্দোলন করা ব্যক্তি চান তিন তিনবার নির্বাচনজয়ী নেতা এবং ক্ষমতাসীন দলের সফল সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগ! তার কথা শুনে বলতে ইচ্ছা করে, ‘আস্তে কন সাব, ঘোড়ায় ভি শুইন্না হাসবো।’
মুখের সামনে মাইক থাকলে কতকিছুই না বলা যায়। বিএনপির সব শিয়ালের মুখে এখন এক রা। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে। রাষ্ট্রের সব গণতান্ত্রিক ইনস্টিটিউশন ধ্বংস করে দিয়েছে। বিচার বিভাগের কোনো স্বাধীনতা নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। মির্জা ফখরুল যদি একবার চোখ খুলে পেছনে তাকান, তাহলে দেখবেন, অতীতে তাদের শাসনামলে ক্ষমতার যে ব্যভিচার ঘটেছে, তা দেওয়ালে এখনো লেখা আছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তারা তুলছেন, পেছনে তাকালে দেখবেন, এগুলো সবই তাদের কীর্তি। নিজেদের কীর্তির কথাই তারা মাদকাসক্ত ব্যক্তির মতো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওড়িয়ে চলেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত এজন্যেই লিখে ছিলেন, ‘ওরে ভাই, কার নিন্দা করো তুমি, এ আমার এ তোমার পাপ।’
মির্জা ফখরুলদের একটা কথা বলি, আওয়ামী লীগ আজ ক্ষমতায় আছে, কাল নাও থাকতে পারে। কিন্তু নির্বাচনে জিতে বিএনপির আর ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নতুন গণতান্ত্রিক দল ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ঘোরবিরোধী বিএনপি-জামায়াত আর নয়। আওয়ামী লীগ তাদের গত তিন দফার শাসনামলে দেশে একটা কাজ করেছেন। জাতির পিতার মর্যাদা স্থায়ীভাবে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শগুলো বিএনপি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল, সেই আদর্শ আবার দেশের তরুণ প্রজন্মের মনে গেঁথে দিয়েছেন। জাতির পিতার মর্যাদা নষ্ট করে বিএনপি যে খলনায়ককে জাতির শ্রদ্ধার আসনে বসাতে চেষ্টা করেছিল, সেই খলনায়ক আজ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত। তার বীরোত্তম খেতাবও প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন দাবি উঠেছে তার কথিত সমাধিস্থল থেকে তার মরদেহ তুলে অন্যত্র নিয়ে সমাধিস্থ করার।
স্পেন সরকার এ কাজটি করেছেন। জেনারেল ফ্রানকোর মরদেহ জাতীয় বীরদের সমাধিস্থল থেকে বহু দূরে শহরের বাইরে নিয়ে আবার সমাধি দেওয়া হয়েছে। স্পেনের জনগণ তাতে সমর্থন জানিয়েছেন। জেনারেল ফ্রানকো ৪০ বছর ধরে স্পেনের মানুষের ওপর স্বৈরাচারী শাসন চালিয়েছেন। অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছেন গণতন্ত্রমনা বুদ্ধিজীবীদের ওপর। বাংলাদেশের টিনপট ডিক্টেটর জেনারেল জিয়ারও আদর্শ ছিল স্পেনের এই ডিক্টেটর ফ্রানকো, পর্তুগালের ডিক্টেটর সালাজার, পাকিস্তানের আইয়ুব। এরা সকলেই আজ ইতিহাসের বিস্তৃত ক্রীড়নক। জেনারেল জিয়াও তাই হতে চলেছেন। মির্জা ফখরুলেরা তার সম্পর্কে নিত্য নতুন গল্প তৈরি করে তাকে আর কতদিন বাঁচিয়ে রাখবেন?
কাদের মির্জা যেহেতু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই, সেজন্যে তাকে ‘মিডিয়া হিরো’ বানিয়ে নিরপেক্ষ বাংলা দৈনিকটির যেমন কোনো লাভ হয়নি, তেমনি বিএনপিরও হয়নি। রাবনের ছোট ভাই ছিলেন বিভীষণ। তিনি রামের পক্ষ নিয়েও ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করতে পারেননি। বরং বিভীষণ নামটি এখন একটি গালি। বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিত করতে গেলেই বলা হয় লোকটি বিভীষণ। এই বিভীষণদের নিয়ে বিএনপি ঘর করতে পারবে, রাজনীতি করতে পারবে না।
পাগলা মেহের আলীর একটাই কথা ছিল—সব ঝুট হায়। মির্জা ফখরুলদেরও আজ পাগলা মেহের আলীর অবস্থা মুখে একটাই কথা—আওয়ামী ঝুট হায়।
n লন্ডন, ১৩ মার্চ, শনিবার, ২০২১
