বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সূত্র অনুযায়ী, সারা বিশ্বে মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী, যাদের অধিকাংশই বাস করে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (২০১৫)-এর তথ্যমতে, দেশের মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ১৩ শতাংশের কথা-ভাষা প্রতিবন্ধিতা এবং ৬ শতাংশের অটিজম প্রতিবন্ধিতা রয়েছে, এদের সবার কথা, ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। বাকি ৮১ শতাংশ অন্যান্য প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কথা, ভাষা, সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা এবং খাবার গলধঃকরণ জাতীয় সমস্যা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তাই বলা বাহুল্য, এদেশের প্রতিবন্ধিতা ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে রয়েছে এমন একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর নিঃসন্দেহে কথা, ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতার জন্যে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি স্বাস্থ্যসেবাটি অতীব প্রয়োজন।
স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি
স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বশাসিত চিকিত্সা পেশা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি পেশাকে স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য পেশা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করছে এবং এই পেশা বিশ্বব্যাপী একটি সমাদৃত স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন পেশা। একজন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট গবেষণালব্ধ চিকিত্সা পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে শিশু ও ব্যক্তির কথা-ভাষা, যোগাযোগ, সামাজিক দক্ষতা এবং খাবার গলধঃকরণ সংক্রান্ত সমস্যা নির্ণয় এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে চিকিত্সাসেবা প্রদান করেন।
বাংলাদেশে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ
থেরাপি কোর্স
পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) প্রতিবন্ধিতা ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ব্যক্তিদের জন্য সারাদেশে স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন পরিষেবা সম্প্রসারণের জন্য, দক্ষ স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল। তাই ১৯৯২ সালে অত্যন্ত দক্ষ বহু-বিভাগীয় (Multidisciplinary) স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন্স ইনস্টিটিউট (বিএইচপিআই) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সিআরপি সহজেই অনুধাবন করতে পেরেছিল যে, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিত্সা সেবা ব্যতীত কোনোভাবেই সমন্বিত চিকিত্সা সম্পূর্ণ হচ্ছে না এবং রোগীর সঠিক চিকিত্সা কোনোভাবেই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এর ফলে, বাংলাদেশে ২০০৪ সালে সর্বপ্রথম সিআরপির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএইচপিআইতে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি স্নাতক প্রোগ্রামটি শুরু হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি (ন্যূনতম এক বছর বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপসহ) প্রোগ্রামটি স্বাস্থ্যপেশার অন্যান্য স্নাতক প্রোগামের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সা অনুষদ দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে।
ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা ও পাঠ্যক্রম কাঠামো একজন শিক্ষার্থীর এই কোর্সটিতে ভর্তি হওয়ার জন্য মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে বাধ্যতামূলক জীববিজ্ঞানসহ ন্যূনতম জিপিএ ৭.০০ থাকতে হবে এবং ভর্তি পরীক্ষায় তাকে মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হতে হবে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই কোর্সে চিকিত্সা বিজ্ঞানের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সহ ৩৮টি বিশেষায়িত বিষয়ে পাঠদান করানো হয় শিক্ষার্থীকে। অভিজ্ঞ স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট ফ্যাকাল্টি দ্বারা এই কারিকুলামের পাঠক্রম প্রদান করা হয় এবং সে সঙ্গে দক্ষ ক্লিনিক্যাল স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীকে প্রতি বছর তিন থেকে চার মাস ক্লিনিক্যাল প্লেসমেন্ট (সরাসরি রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সা ব্যবস্থাপনা শিক্ষা) করানো হয়। সক্ষম/ যোগ্য (Competent) স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট প্র্যাকটিশনার নিশ্চিতভাবে সৃষ্টি ও যথাযথ শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে নিজস্ব ক্যাম্পাসে ক্লিনিক্যাল সেটআপ (কাঠামো) এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের একীভূত বিদ্যালয় রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থী সব রকম কথা-ভাষা, যোগাযোগ ও খাবার গলধঃকরণ সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা রোগ নির্ণয়, মূল্যায়ন এবং রোগীর যথাযথ চিকিত্সা ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধীয় তাত্ত্বিক ও ক্লিনিক্যাল জ্ঞান ও সক্ষমতা অর্জন করছে। পেশা ও পেশাজীবীদের উন্নতির জন্য গবেষণা একটি অন্যতম ভূমিকা পালন করে থাকে, এই ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা গবেষণা পদ্ধতি শেখার সুযোগ পাচ্ছেন এবং নতুন নতুন গবেষণার মাধ্যমে পেশার সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি শিক্ষার্থী চার বছরের ক্লিনিক্যাল প্লেসমেন্টে যেসব সমস্যা ও প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত রোগী দেখার সুযোগ পেয়ে থাকেন প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তার কিছু উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা হলো, যেমন, শিশুর দেরিতে কথা বলা, উচ্চারণগত সমস্যা, এপ্রাক্সিয়া, ডিসারথ্রিয়া, তোতলামো, ভাষা-যোগাযোগ বিকাশে দেরি, অটিজম ও অন্যান নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার, খাদ্য গলাধঃকরণজনিত সমস্যা, কণ্ঠস্বরজনিত সমস্যা, ডিসলেক্সিয়া, শ্রবণজনিত সমস্যা ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা, ঠোঁটকাটা-তালুকাটা, স্ট্রোক, বেলস পালসি বা মুখ বাঁকা, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি (মেরুরজ্জুতে আঘাত), মাসকুলার ডিসট্রফি, ডিমেনশিয়া, পারকিনসন্স ডিজিজ, মানসিক স্বাস্থ্যহানির কারণে যোগাযোগে সমস্যা, ইত্যাদি। পেশার মৌলিকত্ব ও কোর্সের গুণগত মান বজায় রেখে দক্ষ স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট প্র্যাকটিশনার নিশ্চিতভাবে তৈরির লক্ষ্যে এই সুনির্দিষ্ট কারিকুলাম এবং কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের শিক্ষা কাঠামো অনুসরণ না করে একজন শিক্ষর্থীকে সক্ষম/যোগ্য স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্টে রূপান্তর করা প্রায় অসম্ভব, যিনি পরবর্তীকালে রোগীর জীবন মান উন্নয়নে নৈতিকতার সঙ্গে প্রমাণ নির্ভর স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন সেবা প্রদান করবেন।
থেরাপিস্ট হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা
‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন-২০১৮’-এর প্রথম তপশিল অনুযায়ী, যে ব্যক্তি সরকার স্বীকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, উল্লেখ্য ন্যূনতম এক বছর বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপসহ কোর্স সম্পন্ন করছেন তিনি শুধু স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট হিসেবে প্র্যাকটিস করতে পারবেন।
২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরে শুধু নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যাই হলো ২১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫৩ জন। বিভিন্ন এনজিওর তথ্য অনুযায়ী, মোটামুটিভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হার মোট জনসংখ্যার ৯ থেকে ১০ শতাংশ। সে হিসেবে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা আনুমানিক প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ। এই প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের কথা-ভাষা, যোগাযোগে এবং খাবার-পানি গলাধঃকরণের সমস্যা আছে। তাই এই পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা যায় স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্টের চাহিদা আসলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক ব্যাপক। পাঁচ বছর মেয়াদি বিএসসি ইন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি সম্পন্নকৃত থেরাপিস্টগণ এখন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, বিশেষায়িত স্কুল এবং বিভিন্ন হাসপাতালে সুনামের সঙ্গে স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করে যাচ্ছেন।
n লেখক : সহকারী অধ্যাপক, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি বিভাগ, সিআরপি, বিএইচপিআই
