নিজেকেও ভালো হতে হবে

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২১, ২১:৪৭

বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিলে জীবন আর জীবন থাকে না। জীবন হয়ে পড়ে পটলচেরা লোচনময়। যাক। এত জটিল কথায় যাওয়ার দরকার নেই। কথা হচ্ছে ‘নেশা’ নিয়ে। নেশা করতে সবাই চাই। নেশায় নাকি কাজ ভালো হয়! কিন্তু নেশা হওয়া দরকার ‘ভালো নেশা’। যেমন বইপড়ার নেশা, মানুষের জন্য কাজ করার নেশা, কর্মনিষ্ঠতার নেশা। কিন্তু নেশা যদি হয় শরীর ধ্বংসের, তবে সেটা খুব ভয়ানক। একটি দেশের তরুণদের ধ্বংস করতে আর কিচ্ছু লাগে না, কেবল বিভিন্ন খারাপ নেশা তথা মাদককে সহজলভ্য করে দিলেই হয়। কিছু দিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট এমন হয়েছে যে, আমরা যা জানি আমরা তা মানি না, আবার আমরা যা বলি তা বিশ্বাস করি না, আবার যা বিশ্বাস করি তা বলি না। এ যেন নিজের সঙ্গে নিজেকে লুকোচুরি করা। এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আজ দেশের উন্নয়ন, দুর্নীতি, মাদক, ধ্বংস আবার সৃষ্টি যেন একই সূত্রে গাঁথা। একটার সঙ্গে আরেকটি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে।

অনেকের মতে, বাংলাদেশ এখন মাদকের মারণ সমস্যায় নাক পর্যন্ত ডুবে গেছে। কোথায় না মাদক জাতীয় জিনিস পাওয়া যায়? পত্রিকায় মাঝেমধ্যে অল্পস্বল্প খবর ছাপা হয়। কিন্তু সেটা হিমবাহের চূড়া মাত্র। সরকার কিন্তু মাদক নিয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে আরো দুই বছর আগেই। ইতিমধ্যে বহু মাদক ব্যবসায়ী ধরা পড়েছে, ক্রশফায়ারে নিহত হয়েছে অনেকে। এতে প্রচলিত কিছু মাদকের সহজলভ্যতা আপাতভাবে কম বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেটা বড় দিঘি থেকে এক ঘড়া পানি তোলার মতো। এটা ঠিক যে, মাদকের চোরা স্রোত পৃথিবীর কোনো দেশই সহজে থামাতে পারে না। মাদক নির্মূলে বিশ্বের অত্যন্ত ধনী দেশগুলোও প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার খরচ করে। কিন্তু তার পরও রক্তবীজের ঝাড়ের মতো মাদক কখনো নির্মূল হয় না। এমনকি একটি জনপ্রিয় মাদক দুর্লভ হয়ে পড়লে সেই স্থানে দখল নেয় নতুন কোনো মাদক। সম্প্রতি বাজারে প্রচলিত কিছু সহজলভ্য ওষুধও এই সুযোগে নতুন মাদকের জায়গা দখল করে নিয়েছে বলে জানা গেছে। যেমন মারণনেশা ইয়াবার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিছু ব্যথানাশক ট্যাবলেট। অবশ্য মাদক হিসেবে ব্যবহূত এসব ট্যাবলেট বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিতে কয়েক মাস আগে নির্দেশ দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন।

এটা একটা বেশ মজার ব্যাপার যে, একটি নেশার দ্রব্য দুর্লভ হয়ে পড়লেও যারা নেশায় আসক্ত তারা যে কোনোভাবেই হোক বিকল্প কিছু একটার ব্যবস্থা ঠিকই করে নেয়। কিছু ওষুধের পাশাপাশি এভাবেই কখনো-সখনো টিকটিকির লেজ, কেরোসিন তেল, আঠা, সাপ প্রভৃতি নেশার বিকল্প হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো, নেশা কেন করতেই হবে? মাদকাসক্তরা কি জানেন না, মাদক মানুষের বিবেক বা বোধশক্তিকে নষ্ট করে দেয়? তারা কি দেখেনি সর্বনাশা নেশার কবলে পড়ে তার আশপাশেই অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে? মাদকাসক্তের কারণে এবং নেশার চাহিদা মেটাতে গিয়ে একজন মানুষ বাহ্যজ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে। তখন সে যে কোনো অপরাধমূলক কাজ করতে পারে। চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাইসহ কোনো অপরাধ করতেই কুণ্ঠিত হয় না মাদকাসক্তরা।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মাদকাসক্তির জন্য রয়েছে অনেক কারণ। কোথাও সেই কারণ হতাশার, কোথাও অভাবের, কোথাওবা দুশ্চিন্তার। কেউ কেউ বন্ধুবান্ধবের খপ্পরে পড়ে কেবল শখের বশে প্রথম প্রথম মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। তারপর ক্রমশ সব ধরনের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক জটিলতা, অভিভাবকের অবহেলা ইত্যাদি বিষয়গুলোও অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের নেশার দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। অর্থাত্ সার্বিকভাবে জীবনের অনিশ্চিয়তা, পরিবেশের কুপ্রভাব ও নিষিদ্ধ কাজের প্রতি উন্মাদনা, কৌতূহল, অহমিকা, দারিদ্র্য ও অর্থের প্রাচুর্যও প্রাণবন্ত যুবসমাজকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সুতরাং সমাজের এসব সমস্যা আগে নির্মূল করতে হবে।

একটি হাস্যরস দিয়ে এ লেখা শেষ করা যাক। জঙ্গলে এক চিতা বিড়ি খাচ্ছিল, তখন এক ইঁদুর এসে বলল, ‘ভাই নেশা ছাইড়া দাও, আমার সঙ্গে এসো, দেখো জঙ্গল কত সুন্দর! চিতা ইঁদুরের সঙ্গে যেতে লাগল, সামনে হাতি সূচ ফুটিয়ে ড্রাগ নিচ্ছিল, ইঁদুর হাতিকেও একই কথা বলল। এরপর হাতিও ওদের সঙ্গে চলতে শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা দেখল বাঘ মদ খাচ্ছে, ইঁদুর যখন তাকেও একই কথা বলল, তখন সঙ্গে সঙ্গে বাঘ মদের গ্লাস রেখে ইঁদুরকে একটি কষে থাপ্পড় মারল। হাতি বিরক্ত হয়ে বলল, বেচারা ইঁদুর তো খারাপ কিছু বলে নাই। ওকে কেন মারছ? বাঘ তখন হুঙ্কার দিয়ে বলল, এই শালা ইঁদুর গতকালকেও গাঁজা খেয়ে আমাকে তিন ঘণ্টা জঙ্গলে ঘুরাইছে।

অর্থাত্ ভালো ভালো কথা বললেই হয় না, নিজেকেও ভালো হতে হয়। 

n লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক