বিভিন্ন কারণে নদী হারিয়ে যাচ্ছে। একেকটি নদী যেন কালের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসে আশ্রয় নিতে চলেছে। নদী ও বাংলাদেশ একই সুতোয় বাঁধা দুটো নাম। এদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই এই নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে। আমরা লক্ষ্য করলেই দেখতে পারব যে, কলকারখানা, গৃহস্থালির বর্জ্য অপসারণের জন্য আমরা নদীকেই বেছে নিয়েছি, যে নদী হতে পারত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। নদীতে কারখানার ৬০ ভাগ বর্জ্য, ঢাকা ওয়াসা এবং সিটি করপোরেশনের ৩০ ভাগ বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে ১৩ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর জমা হয়েছে। এগুলো অপসারণের জন্য জোরালো ও কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
হিমালয় থেকে ছুটে আসা অসংখ্য নদ-নদীর প্রবাহের সঙ্গে বহমান বিন্দু বিন্দু পলিমাটি হাজার বছরের পরিক্রমায় গড়ে তুলেছে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ যার নাম বাংলাদেশ। নদী থেকে বয়ে আসা পলিমাটিতেই বাংলাদেশের কৃষিজমি অত্যন্ত উর্বর হয়। সেচ ও বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে দেশে ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে বিদ্যুত্ পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আর এতে নদীর অবদান ব্যাপক। কিন্তু মানবসৃষ্ট দূষণের কবলে পড়ে গত ৩ যুগে প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার নদীপথ বিলীন হয়েছে। এমতাবস্থায়, দেশের নদী খনন অত্যন্ত জরুরি। কারণ ২৪ হাজার কিলোমিটার নদী পথের মধ্যে এখন মাত্র ৫ হাজার কিলোমিটার নদীপথ আছে। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। আদিমকাল থেকেই বাংলাদেশের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি, যাতে নদী নানাভাবে সহায়তা করে আসছে। বর্তমানে অধিকাংশ নদীই গ্রীষ্মকালে শুকিয়ে যাওয়ার কারণে অনাবাদি রয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণেই নদীগুলো নাব্য হারিয়ে ফেলছে। ফলশ্রুতিতে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ও উজান থেকে নেমে আসা পানি ধারণ করতে পারে না। যার ফলাফল হচ্ছে ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০৪, ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী বন্যা।
নদী একটি দেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু এর সঠিক পরিচর্যা না করলে জনজীবনে তা অভিশাপ হয়ে দেখা দিতে পারে। যেমন: সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে গোমতী নদী কুমিল্লার দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ না থাকায় দেশের উত্তর জনপদের বিভিন্ন জায়গায় শত শত জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। তিস্তার আশেপাশের এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে গোটা উত্তর অঞ্চলে মরুময়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় নদীর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা, সুখ-দুঃখ, আবেগ-ভালোবাসা, ইতিহাস, ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় নদীপথ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের বাংলাদেশে যানজটের সমস্যা প্রবল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় তো এখন রীতিমতো যান্ত্রিকতার বাতাস বয়। ‘নাম্বিও’ নামের একটি গ্লোবাল ডেটাবেইসের সমীক্ষায় ২০১৯ সালে ঢাকাকে বিশ্বের সর্বাধিক যানজটের শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এমতাবস্থায়, নদীপথকে কাজে লাগিয়ে যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারি। তাই সঠিক ব্যবস্থাপনা ও যুগোপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে অগ্রসর হতে হবে।
উদ্যম জলের কল্লোলে মাতোয়ারা এই নদী দেশের সার্বিক উন্নয়নে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও যাত্রী পরিবহন, প্রত্যন্ত স্থানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, নির্মল পানি সরবরাহ, কৃষি জমিতে পলি সরবরাহ, কৃষি জমিতে পানি সেচ, মাছের সরবরাহ বৃদ্ধি, পানি বিদ্যুত্ উত্পাদন, সামুদ্রিক বন্দরে পণ্য জোগান এবং আমদানি পণ্যের সুষ্ঠু বণ্টন প্রভৃতি উন্নয়ন কাজে এ দেশের নদীগুলো সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তাই দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থেই নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে তাদের গতিপথ ও নাব্য। নদী তার অপরূপ সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে। তাই আমাদেরও নদী রক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। প্রচলিত আইনের কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। নদী রক্ষার জন্য সবার মধ্যে তৈরি করতে হবে সচেতনতা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
