রেজাউল হক কৌশিক
দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে রীতিমতো বিপ্লব চলছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। পুরোনো অ্যাকাউন্টগুলোও সচল হচ্ছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্যই মানুষ এখন মোবাইল ব্যাংকিং নির্ভর হয়ে উঠেছে। এখন অনলাইনে কেনাকাটা থেকে শুরু করে, ইউটিলিটি বিল প্রদান, চাকরির বেতন পর্যন্ত সবই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। আর যখন খুশি টাকা উঠানো, টাকা পাঠানো, মোবাইল ফোনে রিচার্জ করার মতো সুবিধা তো রয়েছেই।
মূলত, ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা কমাতেই মানুষ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে। ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ানোর বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি মিলছে মানুষের। দিন যত গড়াচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে উঠছে। বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বর্তমানে দৈনিক গড় লেনদেন হচ্ছে দুই হাজার কোটি টাকার উপরে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা শুরু হওয়ার আট বছরের মাথায় এজেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৪৫ হাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ (জানুয়ারি পর্যন্ত) হিসাবে দেখা গেছে, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিয়ের নিবন্ধিত গ্রাহক ১০ কোটি ছাড়িয়েছে। আদমশুমারির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে মানুষ এখন সাড়ে ১৬ কোটি; সে হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিয়ের গ্রাহকসংখ্যা অর্ধেকের বেশি। অবশ্য শহরের একজন মানুষের একাধিক কোম্পানির মোবাইল অ্যাকাউন্ট আছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএসে লেনদেন কয়েকটি কারণে বেড়েছে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকার পর আবার খুলেছে। অনলাইন কেনাকাটার লেনদেন হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বেতন দিচ্ছে। মানুষ ক্রেডিট কার্ডের বিলসহ ব্যাংকিংয়ের অনেক সেবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিচ্ছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নানামুখী ব্যবহার আর সহজলভ্য হওয়ার কারণে গ্রামীণ জনজীবনকে অনেক সহজ করেছে। এ সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই অনেক কাজ করা যাচ্ছে। বাস, ট্রেনের টিকিট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন পরিশোধ করা যাচ্ছে মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট যন্ত্রটির মাধ্যমে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেসব কাজ করা যায় সেগুলো হলো, রেমিট্যান্স পাঠানো, ক্যাশ ইন ক্যাশ আউট, একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্যজনের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো, ইউটিলিটি বিল দেওয়া, মোবাইল ফোনের এয়ার টাইম কেনা, পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট পেমেন্ট, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা, বিমা প্রিমিয়াম, ডিপিএস দেওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সুবিধাবঞ্চিতদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরের বছর পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। ১৯৯৯ সালে ইউরোপিয়ান ব্যাংকে সর্বপ্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। মূলত, স্মার্টফোন উদ্ভাবনের পরে মোবাইল ওয়াপ (ওয়্যারলেস অ্যাপ্লিকেশন প্রটোকল) পদ্ধতির মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং শুরু হয়।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা মোবাইল অপারেটর ভিত্তিক হলেও বাংলাদেশে এ সেবা ব্যাংকভিত্তিক। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সেবা দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ১৫টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত আছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করলেও এখন সবচেয়ে এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। এর বাইরে ডাক বিভাগের ডিজিটাল সেবা নগদ ব্যবসায়িক দিক থেকে বেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
