খনন হলেও ফেরেনি গোমতির নাব্য

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২১, ২২:৫৬

নদীর নাম গোমতী। চলনবিলের বুক চিড়ে এই নদীর প্রবাহ। বাঘাবাড়ি থেকে উত্তর জনপদের প্রায় আটটি জেলাতে নৌ চলাচলের মাধ্যম এটি। এক সময়কার উত্তাল গোমতী এখন দখল-দূষণ আর ভরাটের কবলে। কেবল বর্ষা মৌসুমেই এই নদীতে ছোট নৌকা চলে। আর শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠে ‘নদীর বুক’। গোমতীর জৌলুশ ফেরাতে খনন কাজ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল—নদীর প্রস্থ ও গভীরতা বৃদ্ধি এবং নাব্য ফেরান। যাতে নৌ-চলাচলে গতি বাড়ে, বিল এলাকার মানুষ নদীর পানিতে সেচ সুবিধা পান এবং উন্মুক্ত জলরাশিতে মাছ শিকার করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এসবের কিছুই হয়নি। নদী খনন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নাব্য ফেরেনি। খননের উচ্ছিষ্ট মাটিতেই আবার সংকুচিত হয়েছে নদী।

শুধু যে গোমতী নদীর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে তা নয়। খননকাজ চলছে চলনবিলের আত্রাই, গুমানী, তুলশীগঙ্গা নদীতেও। এই নদীগুলোর প্রতিটি নদী খননের ক্ষেত্রেই নানা অনিয়ম অসংগতি ফুটে উঠেছে। কোনো নদীই ঠিকঠাক খনন করা হয়নি। শুধু খননে অনিয়ম নয়, দখল-দূষণ আর ভরাটের কবলে পড়ে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে চলনবিলের ২২টি নদী। রাজশাহীর চারঘাট থেকে উত্পত্তি হয়ে চলনবিলের মধ্যে দিয়ে মুশাখা, নন্দকুজা, চিকনাইসহ বেশ      কয়েকটি নদীর জন্ম দিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ির হুড়াসাগর হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে বড়াল। প্রমত্তা বড়ালের উত্পত্তিস্থলে চারঘাট পৌরসভা ৪০০-৬০০ ফিট নদী দখল করে দুইটি স্থাপনা নির্মাণ করেছে। চাটমোহর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সংলগ্ন আরো ৮০০ ফিট নদী দখল করে মার্কেট নির্মাণ করেছে চাটমোহর পৌরসভা। এছাড়া পাবনার আটঘরিয়া থেকে বনপাড়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার নদী দখল করে সরকারি অফিসসহ ব্যক্তিমালিকানা বহু স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া প্রায় ৬০০ ফিট প্রস্থের আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, গুড়, করতোয়া, তুলসী চেঁচিয়া, তুলশীগঙ্গা, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গাসহ প্রায় ২২টি নদীর দুইপাড় দখল করে বসতি নির্মাণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ১৮টি খালের মধ্যে নবীরহাজির জোলা, হকসাহেবের খাল, নিমাইচড়াখাল, বেশানীরখাল, গুমানীখাল, উলিপুরখাল, সাঙ্গুয়াখাল, দোবিলাখাল, কিশোরখালির খাল, বেহুলারখাড়ি, বাকইখাড়া, গোহালখাড়া, গাড়াবাড়ি খাল, কুমারভাঙ্গাখাল, জানিগাছার জোলা, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।

এসব খাল বিল নদী রক্ষা করতে বিভিন্ন সংগঠন সংগ্রাম করে যাচ্ছে। চলনবিল রক্ষা কমিটির সভাপতি মানবাধিকার-কর্মী অধ্যাপক আত্হার হোসেন বলেন, এসব নদী ও খালের প্রায় সবটুকুই বেদখল হয়ে গেছে। তাছাড়া যেভাবে নদীগুলো খনন করা হচ্ছে তাতে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। স্থানীয়রা বলছেন, নদী খননে এমন দৃশ্যমান অনিয়ম করা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ও বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান জানান, সম্প্রতি ২২০ কিলোমিটারের বড়াল নদীটির উদ্ধারে আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

সরেজমিন দেখা গেছে, চলনবিলের তিনিটি নদীর প্রস্থ ন্যূনতম  ৯৭ ফিট আর ৮ ফিট গভীর করে খনন করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। এছাড়া খননের মাটি বিক্রি করার পাশাপাশি নদীর দুই ধারে স্তুপ করে রাখা হয়েছে। ভাঙ্গুড়ার এরশাদ নগর থেকে গুরুদাসপুর রাবারড্যাম পর্যন্ত ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দে ৯৭ কিলোমিটারের আত্রাই নদীর খনন কাজেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খননকাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং। এছাড়া গুমানি নদীর খনন কাজ করেছেন জেলে থাকা সাহেদ। ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রকল্প ইনচার্জ ইয়াকুব আলী বলেন, তারা ওপরের নির্দেশনা মোতাবেক ২.২ থেকে ২.৪ মিটার পর্যন্ত গভীর করছেন। তবে সবখানে খনন করা হচ্ছে না।

তবে নদী খনন দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএর সহকারী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান নদী খননের ব্যাপারে কোনো তথ্য সরবরাহ করেননি। এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্যও দেননি।

নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু রায়হান বলেন, নদী থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চলমান আছে। তাছাড়া বড়াল, নারদ ও মুসাখা নদীর খননকাজ অল্প দিনেই শুরু হবে।