সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া আমাদের জীবনে নতুন নতুন অনেক কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটছে। একসময় যা ছিল কল্পনারও বাইরে, এখন তা আমাদের হাতের নাগালের মধ্যে চলে আসছে। আমাদের যাপিত জীবন ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠায় অনেক কিছুই সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে। মোবাইল ব্যাংকিং তেমনি একটি নতুন অধ্যায়, যা যুক্ত হয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দিতে শুরু করেছে অনেক ব্যাংক। মোবাইলের মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি তার ব্যাংক একাউন্টের ব্যালান্স ও লেনদেন সম্পর্কিত তথ্য পেয়ে থাকেন। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে থাকা বিরাট জনগোষ্ঠী সাশ্রয়ীভাবে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কথা বলা আর এসএমএস আদান-প্রদানে সবাই অভস্ত হলেও ব্যাংকিং কার্যক্রমে মোবাইলের ব্যবহার আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার নানা কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে টাকা জমাদান ও উত্তোলন, পণ্য বা সেবা ক্রয়ের মূল্য পরিশোধ যেমন—গ্যাস বিল, বিদ্যুত্ বিল, টেলিফোন বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা বিতরণ, ফরেন রেমিট্যান্স অর্থাত্ প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ প্রেরণ, সরকারি বেতন-ভাতা মাঠ পর্যায়ে পাঠানো, এটিএম থেকে টাকা তোলা ইত্যাদি। মোবাইল একাউন্টের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া সম্ভব। মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম এত দিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চালু থাকলেও বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ সাশ্রয়ী ও নিরাপদ ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছে খুব সহজেই। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পূরণে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর করতে ইতিমধ্যে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপগুলোর মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ একটি। এই সেবার মাধ্যমে যদি দেশের শতকরা ৫০ ভাগ মোবাইল ফোন গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা যায়, তাহলে আমাদের সবার জীবনযাপনে গতির সঞ্চার হবে। ব্যাংকে যাওয়া-আসার ঝক্কিঝামেলা থেকে বেঁচে যাবেন বেশির ভাগ গ্রাহক। ঘরে বসে কিংবা নিজের অফিসে বসেই ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করতে পারবেন। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর ক্ষেত্রে অধিকাংশ ব্যাংকই জোর তত্পরতা শুরু করে দিয়েছে। ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে এসএমএম ব্যাংকিং। এই সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট শাখার গ্রাহক হতে হয়। নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফরম, নমুনা স্বাক্ষরসহ শাখায় জমা দিয়ে রেজিস্টার্ড সদস্য হতে হয়। ব্যাংকের কোনো নতুন পণ্য বা সেবা, ব্যাংকিং অথবা অন্যান্য তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসএমএসের মাধ্যমে পেতে হলে অবশ্যই একাউন্ট হোল্ডার, মানে হিসাবধারীকে এসএমএস ব্যাংকিংয়ের রেজিস্টার্ড সদস্য হতে হবে। এসএমএসের মাধ্যমে একাউন্টের ব্যালেন্স, লেনদেনের সংক্ষিপ্ত বিবরণী, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, মেয়াদি ও সঞ্চয়ী হিসাবে মুনাফার হার ইত্যাদি জানা সম্ভব হচ্ছে।
মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকৃত অনলাইন ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা হচ্ছে। সারা দেশের যে কোনো জায়গায় যে কোনো সময়ে ব্যাংকিং সেবা প্রদান সহজতর হয়ে উঠেছে। এটা তুলনামূলকভাবে বেশ সুবিধাজনক, সহজলভ্য ও নিরাপদও বটে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পরিচালিত সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রাহক নিবন্ধন, নগদ টাকা জমাদান, নগদ টাকা তোলা, যা ব্যাংক মনোনীত এজেন্টরা তাদের নিজস্ব মোবাইল থেকে লেনদেন পরিচালনা করবেন। এ ধরনের ব্যাংকিং সেবা বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে মার্চেন্ট পরিচালিত সেবার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটার বিল পরিশোধ। গ্রাহকদের নিজের মাধ্যমে পরিচালিত সেবার মধ্যে রয়েছে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ (বিদ্যুত্, গ্যাস, ওয়াসার বিল), মোবাইল ফোনে তাত্ক্ষণিক ব্যালেন্স রিচার্জ, ব্যালেন্স জানা, একাউন্টের বিবরণী জানা এবং পিন পরিবর্তন। নিবন্ধিত গ্রাহকেরা তাদের মোবাইল থেকে এসব লেনদেন পরিচালনা করবেন। এ ছাড়াও বৃহত্ ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বিতরণ, সরকারি ভাতা বিতরণ (বয়স্ক, বিধবা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ইত্যাদি) এবং বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো টাকা তাদের পরিবারের লোকজনকে প্রদানের কাজও আজকাল মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমের আতওায় চলে আসায় এই কাজগুলোর ঝক্কি-ঝামেলা, হয়রানি, দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি অনেকাংশে দূর হয়েছে।
ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত যে কোনো এজেন্ট পয়েন্টে মোবাইল একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করা যাচ্ছে। বিভিন্ন মোবাইল ফোনে অপারেটর কোম্পানি ইতিমধ্যে দেশ জুড়ে এজেন্ট মনোনয়ন দিয়েছে। যারা ব্যাংকের এজেন্ট সনদ ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যানার প্রদর্শন করতে পারবে, তারাই ব্যাংকের গ্রাহক রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে। যে কোনো মোবাইল অপারেটরের মোবাইল ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট কোম্পানির মনোনীত এজেন্ট পয়েন্টে তার মোবাইল রেজিস্ট্রেশন করতে পারছেন। ব্যবহারকারীদের মোবাইল ফোন নম্বরটিই হচ্ছে তার মোবাইল একাউন্ট নম্বর। মোবাইল একাউন্টের যাবতীয় গোপনীয়তা রক্ষার বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। মোবাইল একাউন্ট গ্রাহকেরা এজেন্টের কাছ থেকে টাকা জমা দেওয়া ও তোলার সুবিধা লাভ করছেন। একাউন্ট খোলার সঙ্গে সঙ্গে টাকা জমা দেওয়া যাচ্ছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ১০ কোটি ছাড়িয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধিত গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৫ লাখ। যদিও এসব অ্যাকাউন্টের মধ্যে সচল রয়েছে ৩ কোটি ২৪ লাখ। কোনো অ্যাকাউন্টে টানা তিন মাস লেনদেন না হলে তা সচল হিসেবে বিবেচিত হয় না। এমএফএস সেবা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারিভিত্তিক প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম-নীতি মেনে বর্তমানে ১৫টি প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। জানুয়ারিতে সারা দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের এজেন্টের সংখ্যা ১০ লাখ ৪৫ হাজার, আগের মাসের তুলনায় যা ১৪ হাজার ৩১০ জন কম। মূলত কোনো অনিয়মে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেলে বা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকলে এজেন্টের অনুমোদন বাতিল হয়ে যায়। বিকাশ, রকেটসহ বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে ডাক বিভাগের ‘নগদ’ নিজেদের মতো করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট ৫৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এতে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। আগের মাস ডিসেম্বরে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা লেনদেন হয়। এর আগে এক মাসে সর্বোচ্চ ৬৩ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের রেকর্ড রয়েছে গত জুলাই মাসে। জানুয়ারিতে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে লেনদেনের মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো ১৮৯ কোটি টাকা সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ক্যাশ-ইন হয়েছে ১৭ হাজার ২১২ কোটি টাকা। ক্যাশ-আউটের পরিমাণ ১৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। ২ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বেতন দেওয়া হয়েছে। ইউটিলিটি বিল পরিশোধ হয়েছে ৮০৩ কোটি টাকা।
n লেখক :সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা
