আজ বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই ভোক্তা। একজন ভোক্তা হিসেবে রয়েছে তার ‘ভোক্তা অধিকার’; কিন্তু ভোক্তার অধিকার কী, প্রতারিত হলে কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে—তা জানেনই না ভোক্তা নিজেই। ভোক্তা অধিকার নিয়ে যেসব সংগঠন কাজ করছেন, সে সব সংগঠনের কার্যক্রম দেখা যায় শুধু ভোক্তা অধিকার দিবসেই। দিবস পালনার্থে দিনব্যাপী আলোচনা, শোভাযাত্রা, মানববন্ধনের মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ থাকে দিবসের কর্মসূচি। সারা বছর নীরবেই ঢাকা পড়ে থাকে ভোক্তার অধিকারের বিষয়গুলো। সময়ে অসময়ে আমাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।
এদিকে সামনে রমজানকে ঘিরে সক্রিয় বাজার সিন্ডিকেট। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাজারে নিয়মিতই বাড়ছে। সরু চালের পর মোটা ও মাঝারি চালের দামও বাড়ল নতুন করে কেজিতে দুই টাকা করে। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহের মধ্যেই দুই বার বাড়ল চালের দাম। প্রতি বছর ধানের মৌসুমের সময় চালের দাম কমে; কিন্তু এবার সদ্যসমাপ্ত আমনের মৌসুমেও চালের দাম কমেনি, উলটো বেড়েছে এবং এখনো বাড়ছে। খুচরা বাজারে নিম্নমানের মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা কেজিতে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, মাঝারি পাইজাম/লতা ৫০ থেকে ৫৮ টাকা আর সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে শুধু চালের দাম নয়, গত এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে আলু, পেঁয়াজ, আদা ও ব্রয়লার মুরগির দামও। পেঁয়াজে নতুন করে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে কেজিতে। সয়াবিন তেলের দামও আকাশছোঁয়া। কেজিতে ১০ টাকা করে বেড়েছে আদাতে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম ১০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর নিত্যপণ্যের এমন ঊর্ধ্বগতিতে বিপাকে স্বল্প আয়ের মানুষ। এ অবস্থায় এখনই বাজার স্থিতিশীলতার দিকে নজর না দিলে বাজারকে অস্থির করার সুযোগ নেবে অসাধু চক্র।
এতত্সত্ত্বেও দেখা যায়, নানাভাবে প্রতারিতও হচ্ছে ভোক্তারা। ভেজাল পণ্যের ছড়াছড়ি দেশের খুচরা বাজারগুলোতে। আবার কখনো কখনো মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কিনেও বিড়ম্ব্বিত হই, পণ্য ফেরত দিতে চাইলে করতে হয় অনেক বাগিবতর্ক। নিরাপদ এবং ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনতে পারাটা ভোক্তার অধিকার এবং তা আইন দ্বারা সংরক্ষিত। বিক্রেতারা যাতে কোনোভাবেই ক্রেতাদের ধোঁকা দিতে বা ঠকাতে না পারেন, সে লক্ষ্যেই ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ এবং তাদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে সংসদ কর্তৃক গৃহীত ‘ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ ২০০৯’ আইনটি ২০০৯ সালের ৫ এপ্রিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে এটুকু সত্য যে, আইনটি প্রণয়নের ফলে জনগণ এর সুফল কিছু কিছু ক্ষেত্রে অল্পবিস্তর হলেও পেয়েছে। পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানও আগের থেকে অনেক সতর্ক হয়েছে; কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ যতটা হওয়ার কথা, ঠিক ততটা চোখে পড়ে না। এর মূলে রয়েছে আইনটি সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা। অশিক্ষিত থেকে শুরু করে শিক্ষিত শ্রেণিও ‘ভোক্তা অধিকার আইন’ সম্পর্কে তেমনভাবে জানে না। যার ফলে এই আইনের সুফল পাচ্ছে না সাধারণ ক্রেতারাও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোক্তা আইন এতটা সক্রিয় যেখানে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন করা কল্পনাতীত। এই আইনে ভেজাল বা প্রতারণা করলে লাইসেন্স বাতিলসহ ফৌজদারি আইনে দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখার পাশাপাশি এই আইন লঙ্ঘনে অর্থ জরিমানা ও কারাদণ্ডসহ উভয় দণ্ডের বিধানও রয়েছে।
তাই আইনের সুফল ভোগ করার জন্য নাগরিককেই সচেতন হতে হয়, তা না হলে অসাধু শ্রেণি অন্যায়ভাবে সুবিধা নেবে এটাই স্বাভাবিক। শুধু আইন এবং অধিদপ্তর নয়, সরকারি এবং বেসরকারিভাবে শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত করতে হবে সচেতনতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাম্পেইনিং। সেই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ে আয়োজন করতে হবে প্রচারণা কিংবা পথনাট্য, যাতে করে প্রতিটি নাগরিক একজন ভোক্তা হিসেবে এই মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। কাজেই ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতকরণে আইন প্রয়োগ, প্রশাসন ও নাগরিককে একই মাত্রায় কাজ করতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
