জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চাপরাশিরহাট ও বসুরহাট পৌর এলাকায় গত কিছুদিনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দুই গ্রুপের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় দুজন নিহত ও কমপক্ষে ২০ জন আহত হন। এসময়ে প্রকাশ্যে দিন-দুপুরে দুই গ্রুপের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও গোলাগুলি করতে দেখেছে সাধারণ মানুষ। সংঘর্ষের সময় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও হতাহতের ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ তথা নোয়াখালীর মানুষ ও ব্যবসায়ী মহল আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনসহ সারা দেশের মানুষের কাছে এ অস্ত্রবাজির ঘটনা অজানা না থাকলেও একটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ এ পর্যন্ত ৩৫ জনকে গ্রেফতারের কথা বললেও সুনির্দিষ্টভাবে কাউকেই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়নি। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দুই গ্রুপে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের সময় পুলিশ অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করে। পুলিশের সামনেই গোলাগুলির ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শুধু শটগানের গুলি ছুড়ে। বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনের সময় থেকেই মেয়র আবদুল কাদের মির্জা বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। এ সময় তার সঙ্গে স্থানীয় বেশ কয়েক জন নেতার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। এ নিয়ে দলের দুই পক্ষের পরস্পর বিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন কমপক্ষে ৮/১০ জন। মুজাক্কির হত্যার ঘটনার কয়েক দিন পর পিবিআই একজনকে গ্রেফতার করে। ৮ মার্চ আবদুল কাদের মির্জার নেতৃত্বে তার সমর্থকরা বসুরহাট বাজারের রুপালি চত্বরে দলীয় কার্যালয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খানকে মারধর ও লাঞ্ছিত করে। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন রুপালি চত্বরে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিকালে ও রাতে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আলাউদ্দিন নামে এক যুবলীগ কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। গুলিবিদ্ধ হন আরো ১৩ জন।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার অভিযানে ককটেল ও বেশকিছু লাঠিসোঁটা উদ্ধার হয়েছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে কাজ চলছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বলেন, আমরা বিষয়টি দেখছি। এটি আমাদের নিয়মিত কাজ। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়টি আমাদের নজরে আছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজনৈতিক কারণের চেয়ে ব্যক্তি দ্বন্দ্ব, ঠিকাদারি কাজের ভাগবাঁটোয়ারা, নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়েই মূলত এখানে সংঘাত। একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই আব্দুল কাদের মির্জা এবং অপর পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল। নোয়াখালী-৪ আসনের এমপি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর হয়েই মূলত কাজ করেন বাদল। এটি এখন প্রকাশ্য। বাদল বৃহস্পতিবার গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন। পুলিশ আবদুল কাদের মির্জার বিরুদ্ধে আলাউদ্দিন হত্যা মামলা না নেওয়ায় গতকাল রবিবার আদালতে আবদুল কাদের মির্জাসহ ১৬৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। কোম্পানীগঞ্জের গত তিন মাসের ঘটনায় শুধু জেলায় নয়, সারা দেশে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
