সৌদি আরবে ৭০ বছর ধরে বিদেশি শ্রমিকদের জন্য বিদ্যমান অঘোষিত দাস প্রথা ‘কাফালা’র বিলুপ্তি কার্যকর হয়েছে গতকাল রবিবার। শ্রমিকদের সর্বময় অধিকার লঙ্ঘন বিতর্কের জেরে এই নিবর্তনমূলক স্পনসরশিপ ব্যবস্থা বাতিল করার জন্য শ্রম আইন সংস্কার করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ, যা গতকাল থেকে দেশটিতে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে আরব নিউজ, সৌদি প্রেস এজেন্সি, আলজাজিরা, আল-আরাবিয়া, গালফ নিউজ, রয়টার্সসহ গণমাধ্যমসমূহ। খবরে বলা হয়েছে, এখন থেকে দেশটিতে অবস্থানরত বিদেশি শ্রমিকেরা তাদের নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই চাকরি পরিবর্তন করতে পারবেন।
এই সংস্কার বৈপ্লবিক ও ঐতিহাসিক। এর মাধ্যমে সৌদি আরব একটি নতুন যুগে যাত্রা শুরু করেছে। এই সংস্কারের ফলে ১ কোটির বেশি বিদেশি শ্রমিক লাভবান হবেন। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। এই পরিবর্তন খুলে দিয়েছে অপার সম্ভাবনার দ্বার। এর মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকেরা কোনো রকম দায়বদ্ধতার মধ্যে থাকবেন না, তারা তাদের মতো করে স্বাধীন এবং সহজভাবে অনেক কাজ করতে পারবেন। দেশে ফিরে যাওয়া বা সৌদি আরবে অবস্থান করা অথবা ফাইনাল এক্সিটে সৌদি আরব ত্যাগ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শ্রমিক নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে কাজ সম্পাদন করতে পারবেন। এই নতুন আইন প্রবাসীদের চলাফেরার স্বাধীনতা, আবাসিক ভিসা প্রদান ও স্বজনদের ভিজিট ভিসা প্রদানের অধিকার ও সুযোগকে অধিকতর সহজ করবে। এ ছাড়া শ্রমিকেরা নিয়োগকারীর অনুমতি ছাড়াই সৌদি আরবের বাইরে ভ্রমণ করতে পারবেন। বিদেশি শ্রমিকেরা সরকারি সেবার জন্য সরাসরি আবেদন করতে পারবেন আর তাদের চুক্তি ডিজিটাল পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ থাকবে। সৌদি সরকার বলছে, এই নতুন নিয়মের মাধ্যমে তারা কাজের পরিবেশের উন্নয়ন ও দক্ষতা বাড়াতে চায়। বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, এই সংস্কারের ফলে সৌদি আরবের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে এবং শ্রমিক নির্যাতনের অপবাদ থেকে তারা পরিত্রাণ পাবেন। এতে মানবাধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি উভয় পক্ষের আচরণগত ও আর্থিক অধিকারকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে। কাফালা ব্যবস্থায় বহু সৌদি নিয়োগকর্তা সিস্টেমের অনেক বিধানের অপব্যবহার করেছিলেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার আহ্বান জানাচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। কাফালা প্রথায় এমন অনেক নেতিবাচক দিক ছিল, যার ফলে প্রবাসী বেকারত্বের হার বাড়ছিল এবং বৈধ প্রবাসী অবৈধ হয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছিল। কাফালা পদ্ধতির সবচেয়ে বড় অন্ধকার দিক হলো এটি ভিসা বাণিজ্যের জন্য কালোবাজারির সমৃদ্ধি ঘটাচ্ছিল। অন্যদিকে স্পনসরশিপ সিস্টেমটি বিলুপ্ত করা হলে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থা তৈরি হবে, যা সৌদি শ্রমবাজারে বৈপ্লবিক বৈচিত্র্য নিয়ে আসবে। এমনকি বিভিন্ন দেশের দক্ষ পেশাজীবী যারা কাফালা পদ্ধতিতে সৌদি আরবে কাজ করতে আগ্রহী নন, তারাও আকৃষ্ট হবেন। বিভিন্ন দেশ থেকে অত্যন্ত দক্ষ ও যোগ্য প্রবাসীরা কাজ করতে এলে সৌদি আরবের সার্বিক কাজের পরিবেশের ব্যাপক উন্নতি সাধন হবে।
প্রসঙ্গত, এত দিন ধরে কাফালা বা স্পনসরশিপ সিস্টেমটি প্রবাসী শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার মধ্যে সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। সৌদি কফিলরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আইনের মারপ্যাঁচে এত দিন প্রবাসী শ্রমিকদের দাসত্ব করতে বাধ্য করে আসছিল। সৌদি আরবে কাফালা পদ্ধতির কারণে বিদেশ থেকে কর্মীরা সেদেশে গেলে নিয়োগকর্তা বা নিয়োগকারীর প্রতিষ্ঠানের অধীনেই চাকরি করতে হতো। কোনো কর্মী অন্য প্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা বেশি পেলেও তিনি ঐ প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে পারতেন না। সে কারণে কর্মীরা বঞ্চিত হয়ে থাকতেন। মূলত নির্মাণ ও গৃহকর্মে নিযুক্ত শ্রমিকদের বড় ধরনের নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়। মজুরি না পাওয়া, কম মজুরি প্রদানসহ শারীরিক মারধরের মতো অভিযোগ নিয়মিত করছেন শ্রমিকেরা। আল-আরাবিয়া ও রয়টার্স জানিয়েছে, ২০১৮ সালের ১৪ মে সৌদি মন্ত্রিসভায় কাফালা পদ্ধতি বাতিলসংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গত বছরের নভেম্বরে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ব্যাপকভাবে বিতর্কিত কাফালা ব্যবস্থায় সংশোধন আনার পরিকল্পনার ব্যাপারে ঘোষণা দেয়। শুরা কাউন্সিল ও মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক প্রয়োজনীয় অনুমোদনের পরে গত বছরের মে মাস থেকে প্রিমিয়ার রেসিডেন্সি প্রবর্তনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে কাফালা চূড়ান্ত বিলুপ্তকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা কার্যকর হলো। সৌদি আরবের জনশক্তি উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন নাসের আবু থুনাইন রিয়াদে কাফালা নীতিতে পরিবর্তন আনার কথা জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে আমরা একটি আকর্ষণীয় শ্রমবাজার গড়ে তুলতে চাই, এখানে কাজের পরিবেশ উন্নত করতে চাই।
