শিল্পের কাঁচামালের দাম বাড়ছেই

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২১, ২২:৪২

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যবহূত কাঁচামালের দাম পড়তে থাকে। কিন্তু ২০২১ সাল শুরু হতেই এসব কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকে। এখন পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় শিল্পে উত্পাদিত পণ্যের দাম বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের শুরুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা হানা দেওয়ার পর কাঁচামালের দাম ব্যাপকভাবে পড়ে যায়। মূলত কারখানাগুলোর উত্পাদন বন্ধ থাকার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বছরের শেষের দিকে উত্পাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হতে থাকলে কাঁচামালের দামও বাড়তে থাকে। মূলত করোনাকালের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কাঁচামাল রপ্তানিকারকেরা দাম বাড়িয়েছেন বলে জানা গেছে। আবার চীনসহ আরো কয়েকটি দেশ পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় বিপুল পণ্য মজুত করেছে; যা মূল্যবৃদ্ধিকে উত্সাহিত করছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে শিল্পে যেসব কাঁচামাল ব্যবহূত হয়, তার সবগুলোর দামই বেড়েছে। স্টিল, তুলা, সিমেন্টের কাঁচামাল, অপরিশোধিত তেল, বিভিন্ন ধরনের এক্সেসরিজ, সংবাদপত্রে ব্যবহূত কাগজ থেকে শুরু করে এমন কিছু নেই যেগুলোর দাম বাড়েনি। কোনো কোনো শিল্প খাতের মালিকেরা ইতিমধ্যে তাদের উত্পাদিত পণ্যের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন।

দেশের অন্যতম প্রধান খাত বস্ত্র খাত। এ খাতের প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে তুলা। করোনা শুরুর পর তুলার দাম কিছুটা কমতে থাকে। কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ের পর থেকে এ পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি পাউন্ড তুলার দাম ছিল ৬৩ সেন্ট থেকে ৬৩ দশমিক ৩০ সেন্ট। বর্তমানে প্রতি পাউন্ড তুলা বিক্রি হচ্ছে ৭৯ সেন্ট থেকে ৮০ দশমিক ২৫ সেন্টে। এ হিসাবে মূল্যবৃদ্ধির হার সাড়ে ২৮ শতাংশের বেশি। মূলত চীনা কারখানার মালিকদের অতিরিক্ত আমদানির কারণে তুলার দাম বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। দাম আরো বাড়তে পারে—এই আশঙ্কায় চীনা আমদানিকারকেরা এবার অতিরিক্ত তুলা মজুত করেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া পাকিস্তান এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশে তুলার উত্পাদন কম হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। তুলার দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুতার দামও বেড়েছে। উত্পাদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩০ কার্ডেড সুতা কয়েক মাস আগে প্রতি কেজি ২ ডলার ৬০ সেন্ট থেকে শুরু করে ২ ডলার ৮০ সেন্টে বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন এটি বিক্রি হচ্ছে ৩ দশমিক ৬০ সেন্ট থেকে ৩ দশমিক ৭৫ সেন্টে।

শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল স্টিলের বাজারও ব্যাপক ঊর্ধ্বমুখী। এখানে চীনা ব্যবসায়ীদের হাত রয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ। করোনার সময় চীনের নির্মাণ খাত কিছুটা শ্লথ হলে স্টিলের দাম পড়তে থাকে। কিন্তু বসন্তকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর চীনা কারখানাগুলো পূর্ণ মাত্রায় উত্পাদনে গেছে। এতে দেশটির স্টিলের পণ্য ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদাও বাড়তে থাকে। চীনা ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে প্রচুর স্টিল মজুত করেছেন। এছাড়া চীনা সরকার ১২তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এটি বাস্তবায়নে ব্যাপক নির্মাণকাজ চালু রাখতে হবে। এ ধারণা সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা স্টিলের মজুত গড়েছেন। এতে করে আন্তর্জাতিক বাজারে স্টিলের দাম বেড়ে গেছে। লোহার দামও বেশ বেড়ে গেছে এ সময়। ধারণা করা হচ্ছে, লোহার দাম আরো বাড়বে। বর্তমানে প্রতি টন লোহা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ ডলার। এটি আরো বেড়ে ২০০ ডলারে উন্নীত হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও বেড়ে যাচ্ছে। করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের দাম পড়তির দিকে থাকলেও এখন বাড়তি দামে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ব্যবসায়ীদের। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)-এর তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরুতে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানির দাম ছিল ৬২ ডলার। গত জানুয়ারিতে এটি ছিল আরো আট ডলার কম। করোনাকালীন ওপেক সদস্য দেশগুলো তেলের উত্পাদন কমিয়ে দেয়। তখন অবশ্য চাহিদাও কম ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে চাহিদাও বেড়েছে। এতে করে প্রায় প্রতিদিনিই এই কাঁচামালের দাম বাড়ছে।

এদিকে গত কয়েক মাসে বিশ্ববাজারে সংবাদপত্র শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের দামও বেড়ে গেছে। গত তিন মাসে এ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, নিউজপ্রিন্টের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সংবাদপত্র শিল্প সংকটে পড়েছে। বিজ্ঞাপনের মূল্য বাড়িয়ে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভারতের পত্রিকার মালিকদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যমটির খবরে বলা হয়, করোনার কারণে অন্যান্য শিল্পও মারাত্মক সংকটে পড়েছে। সে কারণে শিল্প খাত থেকে যথেষ্ট বিজ্ঞাপন পাওয়ার আশা করা দুরূহ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রকাশকেরা নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।