‘গুণী মানুষের মেধাস্বত্ব বিক্রির জন্য না’

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২১, ২০:৩৯

এদেশের অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা দেলোয়ার আরজুদা শরফ। গানের পেছনের এই মানুষটি অডিও ইন্ডাস্ট্রির সোনালি যুগ থেকে আজ অবধি কাজ করে যাচ্ছেন নিভৃতে থেকেই। নিজের কাজ ও সংগীতের নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিনের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল

আপনার চলমান কাজ প্রসঙ্গে জানতে চাচ্ছি—

বর্তমান কাজ বলতে জি-মিউজিক আর্ট নামে একটি চ্যানেল করেছি আমি ও জিন্নাহ খান। এই চ্যানেলের জন্য ১শ’ গানের একটি প্রজেক্ট চলছে। এরইমধ্যে প্রায় ২০টি গানের কাজ শেষ করেছি। দুটি গানের মিউকিজ রেডি করেছি। এছাড়া বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত শিল্পীর ডুয়েট কিছু গানের কাজ করছি। পাশাপাশি জি-সিরিজ থেকে সালমা ও সঞ্জীবনের গাওয়া আমার কয়েকটি গান রিলিজ হয়েছে। সাউন্ডটেকে আমার বেশকিছু গান জমা দেওয়া আছে। এছাড়া বিজয় দিবস উপলক্ষে আমার নিজের চ্যানেলে জনপ্রিয় কয়েকজন শিল্পীর বেশকিছু গান রিলিজ দেবো।

আপনার ক্যারিয়ারে বেশকিছু শ্রোতাপ্রিয় গান রয়েছে। গানগুলো প্রশংসিত হলেও আপনার ব্যক্তিগত অর্জন কম বলে মনে করেন না?

আমি ‘আমি একটা জিন্দা লাশ’, ‘ইন্দুবালা’র মতো অসংখ্য গান লিখেছি। ক্যারিয়ারে প্রায় ৫ হাজার গান লিখেছি। যারা গানে কণ্ঠ দেন সবাই তাদের নামটাই কিন্তু মনে রাখে। আমরা আড়ালেও থাকি। তবে এটাই ভালো লাগে যে, আমার লেখা গান জনপ্রিয়তা পেল, দেশ থেকে অন্য দেশে, এমনকি মানুষের হূদয়ে ছড়িয়ে গেল, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। অ্যাওয়ার্ড একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া হয়। এটা অনুপ্রেরণার। পরে কিন্তু সেটা ঘরে বাক্সবন্দিই থাকে। কিন্তু একটি গান যদি ছড়িয়ে যায়, তবে সেটা হাজার বছর বেঁচে থাকে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে!

এখন নতুন মাধ্যমে গীতিকারদের সেভাবে মর্যাদা দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে কী বলবেন?

মর্যাদা দেওয়া হয় না এটা ঠিক না। আমরা আসলে সংগঠিত না। তবে এখন সবারই একটি প্লাটফর্ম হয়েছে। এখন কে, কীভাবে তার অধিকার আদায় করবে সেটা তার বিষয়। তাছাড়া ইন্ডাস্ট্রি যদি ডাস্টে পরিণত হয় তাহলে এই গুণী মানুষগুলোর জন্য এটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। গুণী মানুষের মেধাস্বত্ব বিক্রির জন্য না। তবে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করছেন তাদের উচিত এদের মূল্যায়ন করা। কিন্তু তারা নিজেদের নিয়েই ভাবছেন। নিজেরাই ব্যবসা করছেন এই মেধাগুলো নিয়ে। তবে আমাদের এখন সময় হয়েছে নিজেদের অধিকার আদায় করে নেওয়ার।

এখন কোনো হিট গানের দুই লাইন নিয়ে নতুন একটি গান সাজানো হচ্ছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

একটি গান জনপ্রিয়তা পেলে সেটার দুই লাইন নিয়ে নতুন করে গান করা সত্যি অনৈতিক। এটা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। তবে হ্যাঁ, একটা স্টাইল হিট হলে সেই প্যাটার্নে গান করতেই পারে। কিন্তু কপি করা উচিত না।

এখন ‘বাবু খাইচো’ টাইপের গানের ও প্রচুর ভিউ হচ্ছে। যে গানের কাব্যের কোনো মূল্য নেই। এতে আপনাদের মতো যারা সিনিয়র আছেন তাদের ক্ষেত্রে এটা লজ্জার কারণ হয় কি-না?

এ বিষয়ে আমি কথা বলতে গেলে অনেকের কাছে খারাপ লাগবে। এ ধরনের গান সংগীত ইন্ডাস্ট্রিকে দূষিত করছে। এটা এক ধরনের ভাইরাস। এই টাইপের গান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া মানে একটি ভাইরাসকে ছড়িয়ে দেওয়া।

এখন ভিউ গুণে গানের মান বিচার করা হয়। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য শুনতে চাচ্ছি—

দেখুন, ভিউ গুণে গানের বিচার করা যায় না। খারাপ গানেরও ভিউ হয়। ভিউ হলেই সেটা ভালো হবে এমন না। গানের মান বিচার করা যায় তার সম্মান দিয়ে। ভালো কাজ মানুষের হূদয় ছুঁয়ে যায়, সবাই মনে রাখে। কিন্তু ভিউ গোনা গান ও শিল্পী কিন্তু অকালেই ঝরে যায়।

সংগীতজীবনের পূর্ণতা-অপূর্ণতার বিষয়ে কী বলবেন?

আমি গান পাগল মানুষ। গানের সঙ্গে ছিলাম, আছি। অনেক গান শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি। এখনো হাতে প্রচুর কাজ রয়েছে। বলা চলে, আমার চাওয়ার সবটাই পূর্ণ। তবে অপূর্ণতা বলতে, জানে আলম ভাইয়ের সুরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ১৪টি গানের একটি কাজ চলছিল। কিন্তু উনি চলে যাওয়া সেই কাজটি আর করা হলো না। এটা অনেক বড় একটি আক্ষেপের একটি জায়গা তৈরি করেছে।