মার্চ বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্ম-আবিষ্কারের চূড়ান্ত পর্ব

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২১, ০৫:৪০

এ বছর (২০২১ খ্রিষ্টাব্দ) বাঙালি জাতি তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে এবং সঙ্গে সঙ্গে ২০২০ সালের ১৭ই মার্চ থেকে শুরু হয়েছে বাঙালির জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন। জাতি হিসেবে এর চেয়ে গৌরবের আর কিছু হতে পারে না। এই উদ্যাপনের অংশ হতে পারা যে কোনো বাঙালির জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও আনন্দ।

মার্চ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল মাস। ১৯৭১ সালের এই মাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি দীর্ঘ স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রদত্ত মহাকাব্যিক ভাষণে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা তথা জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ঘোষণা ও সামগ্রিক দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।

ইতিহাসের দীর্ঘ পাঠ থেকে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম দীর্ঘ আন্দোলন ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাজিত হলে এই ভূখণ্ডের বাঙালিরা নব্য উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। যে স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যের জন্য বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তদান, পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থতায় পরিগণিত হয়। ১৯৪৮ সালে সূচিত ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি তার অস্তিত্বের প্রকৃত সত্য ও জীবনের গন্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করে এবং এই অস্তিত্ব সচেতন লক্ষ্যাভিমুখী জাতিসত্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিক নির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন।

বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। সেই আত্মপরিচয়ের সংগ্রামকে আত্ম-আবিষ্কার ও স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিসত্তায় উত্তরণের ক্ষেত্রে ২৩ বছরের দীর্ঘ সংগ্রামে বাঙালির আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অংশগ্রহণ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বঙ্গবন্ধুর ছয় (৬) দফার ঘোষণা থেকেই মূলত বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম আত্ম-আবিষ্কারের সুস্পষ্ট ধারায় প্রবাহিত হতে শুরু করে। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বর্বর আক্রমণকালে জাতির পিতার স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা তারই গৌরবোজ্জ্বল ও রক্তস্নাত অধ্যায়।

বাঙালি জাতিসত্তা দীর্ঘ পথচলায় অজস অগ্নি-পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। দুর্জয় মনোবল, দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আত্মত্যাগের মহিমায় আদর্শ নিয়ে সেই সব অগ্নি-পরীক্ষায় বাঙালি জাতি উত্তীর্ণ হয়েছে। বর্তমান জাতীয় ও বিশ্ব-পরিস্থিতিতে সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সুগভীর দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্নিহিত চেতনাই হতে পারে জাতির অগ্রগামিতার মহৎ প্রেরণা।

লেখক: ভাইস-চ্যান্সেলর, শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোনা

ইত্তেফাক/এএএম