আবারও করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২১, ২১:৩৯

বত্সরাধিকাল ধরিয়া সমগ্র বিশ্ব করোনা ভাইরাসের প্রকোপে দিকভ্রান্ত হইয়া রহিয়াছে। ব্রাজিল, ভারত, ইউরোপ ও আমেরিকায় আনুপাতিকহারে তীব্রতা অধিক হইলেও আমাদেরকেও এই ভাইরাস যথেষ্টই জ্বালাইয়াছে। মাসের পর মাস উদ্বিগ্ন থাকিয়া সংক্রমণের হার কিছুটা কমিয়া আসিলে আমরা স্বস্তি বোধ করিতে শুরু করিয়াছিলাম। প্রথম দিকে তীব্রতা দেখা দিলেও ধীরে ধীরে সংক্রমণের হার কমিতেছিল। অন্তত ইউরোপ ও আমেরিকার মতো তৃতীয় ঢেউ, চতুর্থ ঢেউ এতকাল আমাদের ভোগ করিতে হয় নাই; কিন্তু অতি সম্প্রতি আবারও দেশে হঠাত্ করিয়াই সংক্রমণের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বাড়িতে শুরু করিয়াছে। যখন সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার চিন্তা করিতেছে, যখন মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিতে শুরু করিয়াছে, যখন সরকারও করোনা সংক্রান্ত বিধিনিষেধগুলি শিথিল করিতে শুরু করিয়াছিল—তখনই আবার দেশকে উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিয়াছে সংক্রমণের সংখ্যা। এখন কেহ কেহ ইহাকে বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বলিয়া আখ্যায়িত করিতেছেন। ইহার সহিত পুরানা সমস্যাগুলিও ফিরিয়া আসিতে শুরু করিয়াছে। জানা গিয়াছে, চিকিত্সার জন্য হাসপাতালের আইসিইউগুলিতে চাপ বাড়িতেছে। ইতিমধ্যে কোনো কোনো হাসপাতালে সকল আইসিইউ শয্যায় করোনা রোগী ভর্তি হইয়াছে। ইহার পাশাপাশি ভাইরাসের নূতন বৈশিষ্ট্য হইল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাইয়াছে, এই দফা অধিকাংশই তরুণরা আক্রান্ত হইতেছে। ইতিমধ্যে প্রশাসন সকল স্তরে মাস্ক ব্যবহারের উপর পুনরায় জোর দিতে শুরু করিয়াছে।

এত বড় প্যানডেমিক ব্যবস্থাপনায় সরকার ভালোই করিতেছিল। বহু দেশ যেইখানে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির জটিলতায় ভুগিতেছে তখন বাংলাদেশ শুধু ভ্যাকসিন আমদানি নহে, মানুষকে আহ্বান করিয়া বিনা মূল্যে ভ্যাকসিন প্রদান অব্যাহত রাখিয়াছে। অর্থাত্ সময়মতো ভ্যাকসিন পাওয়া, সুব্যবস্থার মধ্যে ভ্যাকসিন প্রদান—সকল কিছু চলিতেছিল নির্ঝঞ্ঝাট; কিন্তু ঢেউ বাড়িতে থাকিলে যে বেগ পাইতে হইবে তাহা অনুমেয়। উহা কেবল স্বাস্থ্যগত নহে, অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ—সকল ক্ষেত্রেই। অধিকন্তু, ভ্যাকসিন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিলেও বিশ্বব্যাপী ভাইরাসের ভিন্ন ধরন তথা ভ্যারিয়ান্ট দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করিয়া তুলিয়াছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্রাজিল ভ্যারিয়ান্ট, সাউথ আফ্রিকা ভ্যারিয়ান্ট এবং ইউকে ভ্যারিয়ান্ট নামে তিন নূতন ধরনের ভাইরাসের প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে যাহা কিছুটা হইলেও ভ্যাকসিনের প্রতি বিশ্বস্ততাকে খাটো করিয়াছে। আবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অ্যাস্ট্রাজেনেকার উত্পাদিত টিকা জনগণের মধ্যে প্রয়োগ আপাতত স্থগিত করিয়াছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অথবা রক্ত জমাট বাঁধার কিছু অভিযোগে। এই সকলই নূতন উদ্বেগের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তবে এখন পর্যন্ত ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষিত উপায় বলা হইতেছে মাস্ক পরিধান এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখিয়া চলাফিরা করা। করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগ ও সরকারের প্রশাসন পুনরায় মাস্ক পরিধানের উপর আবারও জোর দিতে শুরু করিয়াছে। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসন রাস্তায় নামিয়াছে। শুরু করিয়াছে প্রচার। ইতিমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে, সংক্রমণ এই হারে বাড়িতে থাকিলে এবং মাস্ক ব্যবহারে অনীহা দেখা গেলে সরকার শক্ত অবস্থান লইতে বাধ্য হইবে।

যে কোনো দুর্যোগে, যে কোনো সংকটে মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই পারে সংকট হইতে উত্তরণে সহায়তা করিতে। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রতিটি মানুষের সচেতন হওয়া আবশ্যক। নচেত্ বড় ধরনের খেসারত দিতে হইতে পারে। আসুন, আমরা প্রত্যেকে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনাগুলি মানিয়া চলি। সাময়িক অসুবিধা মানিয়া লইয়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখিয়া চলি। বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবী আবার স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরিয়া যাইবে—ইহা আবশ্যকীয় বলিয়া ভাবিতে হইবে। এখনই সকলে সচেতন না হইলে একদিকে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িতে থাকিবে, অন্যদিকে লকডাউনের মতো পরিস্থিতিতে পড়িতে হইতে পারে, যাহা দেশ ও মানুষের জীবনকে স্তব্ধ করিয়া দেয়।