অমর একুশে গ্রন্থমেলা এই প্রথমবার ফেব্রুয়ারি মাসের বাহিরে আজ উদ্বোধন হইতে যাইতেছে। এই ধরিত্রীর জন্য সময়টা ভালো যাইতেছে না। বিশ্বব্যাপী করোনার ঢেউ উঁচু হইতেছে। প্রথমে আমরা ভাবিয়াছিলাম, শীতের শুরুতে করোনোর দ্বিতীয় ঢেউ মাথাচাড়া দিবে। এই আশঙ্কা লইয়া সেই সময় অনেক লেখালেখি হইয়াছে, সতর্কবাণী উচ্চারিত হইয়াছে। কিন্তু সেই সতর্কবাণীর অবস্থা হইয়াছিল মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের মতো। বাঘ আসিয়াছে বাঘ আসিয়াছে বলিয়া চিত্কার করিবার পর দেখা গিয়াছে সেইভাবে আর বাঘ আসে নাই। বরং করোনার প্রকোপ ক্রমশ নিম্নমুখী হইয়াছে। আমরাও ভাবিয়াছি, বুঝি যবনিকা পতন ঘটিল করোনার দুর্বিষহ কালের। সুস্থতার হার বাড়িল, আক্রান্তের হার তলানিতে গিয়া ঠেকিল। আমরাও বহুলাংশে পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করিলাম। যদিও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারংবার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিতেছিলেন—মাস্ক পরা বাদ দেওয়া যাইবে না, ভ্যাকসিনেশন শুরু হইয়াছে মানে আর কোনো ভয় নাই—এমন বোকার স্বর্গে বাস করা যাইবে না। কিন্তু মানুষ তো জাতিগতভাবে স্বেচ্ছাচারী। একটু সুযোগ পাইলেই মানুষ তাহার লাগামহীন আচরণ প্রকাশ করিয়া ফেলে। কোভিডের বিধিপালনের আমরাও সেই স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিলাম। আর ইহার ফাঁকে চুরিসারে পুনরায় নূতন করোনা বাঘ চলিয়া আসিল। সে নীরবে তাহার স্পাইক থাবা চওড়া করিতে লাগিল।
এখন দেখা যাইতেছে, দৈনিক শনাক্ত রোগীর হার ৯ শতাংশ পার হইয়া যাইতেছে, যাহা দুই মাস পূর্বেও ছিল ৩ শতাংশের নিচে। দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আবারও ১৮ শতাধিক হইয়াছে, যাহা এক মাস পূর্বেও ছিল তিন শতের ঘরে। এমতাবস্থায় গ্রন্থমেলা চালু রাখা উচিত হইবে কি? এই জিজ্ঞাসা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হইতেও আসিয়াছে। কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশে পুনরায় লকডাউন, আসন্ন বইমেলা স্থগিত, এক দিন ঈদের ছুটিসহ ১২ দফা সুপারিশ করিয়াছে। সুপারিশের এক নম্বরে বলা হইয়াছে—সম্ভব হইলে সম্পূর্ণরূপে লকডাউনে যাইতে হইবে। সম্ভব না হইলে ইকোনমিক ব্যালান্স রাখিয়া যে কোনো জনসমাগম বন্ধ করিতে হইবে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইকোনমিক ব্যালান্স রাখিবার ক্ষেত্রে গ্রন্থমেলার বিশেষ গুরুত্ব নাই। ইহার অবশ্য অন্য গুরুত্ব রহিয়াছে। বই মানুষের মননকে শানিত করে। কল্পনাশক্তিকে অবারিত দিগন্তে প্রসারিত করে। বইয়ের ক্ষুদ্র অক্ষরের অসীম জগতেই আমাদের এই মানবসভ্যতার প্রাণভোমরা জিইয়ে রহিয়াছে। সুতরাং বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু শুরুতেই তো আমরা বলিয়াছি ধরিত্রীর সময় ভালো যাইতেছে না। জীবনের আগে তো গ্রন্থমেলা নহে।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এবং ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গফুট জায়গায় এইবার বইমেলা অনুষ্ঠিত হইবে। পূর্ববর্তী নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ১৯ মার্চ হইতে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বেলা ৩টা হইতে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকিবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা হইতে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলিবে। আমরা অতীতে দেখিয়াছি, অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ধীরে ধীরে জনসমাগম বৃদ্ধি পায় এবং ছুটির দিন ও বিশেষ দিনগুলিতে ভিড় উপচাইয়া পড়ে। অনেকে গ্রন্থমেলায় এমনিতেই ঘুরাঘুরি করিতে কিংবা আড্ডা দিতে যান। এই চিত্রের ব্যত্যয় কি এইবার হইবে? সেই ক্ষেত্রে গ্রন্থমেলা কি শুরু হইবার পর করোনা পরিস্থিতির আরো অবনতি হইলে স্থগিত হইবার মতো পর্যায়ে চলিয়া যাইবে না? যাইতেই পারে। সুতরাং আমরা আশা করিব, বই যাহারা ক্রয় করিতে চাহিবেন কেবল তাহারাই শারীরিক দূরত্ব মানিয়া, মাস্ক পরিয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া বইমেলা যাইবেন। সকলকে মনে রাখিতে হইবে, সচেতনতাই রক্ষাকবচ। তুলনামূলক শিক্ষিত ও সচেতন জনগোষ্ঠীই গ্রন্থমেলায় আসিয়া থাকেন। তাহাদের নিকট আমরা এই বিশেষ সচেতনতা আশা করিতেই পারি।
