জলজ্যান্ত ভোটাররা মৃত হিসেবে বাদ!

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২১, ২৩:১৬

পঞ্চগড়ে প্রধান শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শতাধিক জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। এতে এসব মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন। ভোটাধিকার প্রয়োগ তো দূরের কথা, ব্যাংক ঋণ নিতে, করোনার রেজিস্ট্রেশন করতে এবং সরকারি সুবিধার ভাতার টাকাও উত্তোলন করতে পারছেন না। সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে পুনঃ ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ দ্রুত পুনঃ ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেলার বোদা উপজেলার ঝলইশালশিরী ইউনিয়নের ধরধরা প্রধানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জীতেন্দ্র নাথ বর্মন ২০০৮ সালে ভোটার তালিকায় নাম উত্তোলন করেন। পাঁচ বছর আগে  ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আপন ছোট ভাই অজিতকে ভোট দিতে পারেননি তিনি। জীবিত থেকে শিক্ষার্থীদের পাঠদানসহ স্বাভাবিক সব কার্যক্রম চালিয়ে এলেও নির্বাচন কমিশনের সার্ভার থেকে তার নাম কর্তন করা হয়েছে। সার্ভারে কোনো তথ্য নেই, তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। বোদা উপজেলা নির্বাচন অফিস ২০১২ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদে জীতেন্দ্রনাথকে মৃত দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম কর্তন করেছে। নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে নাম না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন ইএফটিতেও (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার-বৈদ্যুতিক তহবিল স্থানান্তর) নাম নিবন্ধন করতে পারেননি তিনি। এর ফলে তার বেতন-ভাতা হচ্ছে না, ফিক্সেশনও হচ্ছে না।

একই উপজেলার বোদা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নগরকুমারী এলাকার বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন মনু ২০০৮ সালে ভোটার হন। ২০১৭ সালে বোদা পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। ভোটার তালিকায় নাম ছিল না। নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে নাম না থাকায় ব্যাংকে ঋণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, কোভিডের টিকার রেজিস্ট্রেশনও করতে পারেননি। এছাড়া বোদা পৌরসভার নগরকুমারী গ্রামের ভারতী, বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের মো. অছিরউদ্দিন, একই উপজেলার বেংহারী বনগ্রাম ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের সনেবালা, ঝলইশালশিরী ইউনিয়নের মাঝাপাড় গ্রামের মোছা. নারগিছ, ঝলইশালশিরী ইউনিয়নের কালিয়াগঞ্জ গ্রামের জিরন বালা, ঝলইশালশিরী ইউনিয়নের লাঙ্গলগাঁও গ্রামের কাহাবানী, চন্দনবাড়ী ইউনিয়নের কুমারপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী, একই গ্রামের মো. আজিমউদ্দিন, একই গ্রামের মো. মকবুল হোসেনসহ পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে ১২ জন, তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসে চার জন এবং আটোয়ারী উপজেলা নির্বাচন অফিসে এক জন জীবিত মানুষকে মৃত দেখানো হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক জীতেন্দ্র নাথ বর্মন জানান, বোদা উপজেলা নির্বাচন অফিস ২০১৪ সালে তাকে মৃত ঘোষণা করে। জীবিত মানুষটিকে কারা কীভাবে মৃত বানাল, এর দায়ভার কার—প্রশ্ন তার। ভুক্তভোগী মনোয়ার হোসেন মনু জানান, ‘আমাকে কেন মৃত হিসেবে ভোটার তালিকা থেকে নাম কর্তন করা হলো, তার বিচার চাই। কে আমাকে মেরেছে, এ বিষয়ে তদন্ত করা হোক। আবেদন করার আড়াই মাস পরও ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। বোদা উপজেলার ঝলইশালশিরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।  উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এগুলো কীভাবে হয়েছে তা আমার জানা নেই। পূর্বের কোনো ডকুমেন্টও অফিসে নেই। তবে ভোটার তালিকায় পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য বেশ কিছু আবেদন দেওয়া হয়েছে।’ 

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলমগীর জানান, মৃত্যুজনিত কারণ ছাড়া অন্য কোনো কারণে কারো নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যায় না। হালনাগাদ করার সময় কোনো ডিজিট ভুলের কারণে কিংবা তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজাররা ভুলবশত এমনটি করতে পারেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।