‘বই হলো এমন এক মৌমাছি, যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে।’ ‘বই’কে বলা যায় মস্তিষ্কের আলোকিত সন্তান। আলো যেমন জাগতিক নিয়মে অন্ধকার দূর করে সবকিছু স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলে, তেমনি ভালো বই মানুষের মনের ভেতর জ্ঞানের আলো এনে যাবতীয় অন্ধকারকে দূর করে পরিচ্ছন্ন চেতনার আলোতে সবকিছুকে উদ্ভাসিত করে।
দেশকালের সীমানা অতিক্রম করে জ্ঞানের বার্তাকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে একমাত্র বই। অগোছালো জীবনকে শৃঙ্খলায় আনা, হতাশ মনকে প্রবোধ দেওয়া, শিক্ষা, বিনোদন, নিঃসঙ্গতা দূরীকরণসহ সব বিষয়ের শ্রেষ্ঠ অবলম্বন হতে পারে বই। বইয়ের চিরায়ত আবেদনের প্রসঙ্গে মনে পড়ে পারস্য কবি ওমর খৈয়ামের সেই অমর বাণী,
‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে/ প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে,/ কিন্তু বই—সে তো অনন্ত যৌবনা!’
বইমেলাতে আত্মিক টানে নিজের অজান্তেই ছুটে আসেন বইপ্রেমীরা। প্রতিটি স্টল হয়ে ওঠে একেকটি মুখর আঙিনা, যে আঙিনায় পাঠকরা যেন নিমন্ত্রিত অতিথি। কেউ বইয়ের প্রচ্ছদে মুখ ডুবিয়ে বিষয়বস্তুর গভীরতা খুঁজে ফেরেন, কেউ আবার দু-চার পাতায় দৃষ্টি দিয়ে নিজেকে নিয়ে যান স্বর্ণালি অতীতে, কেউবা আবার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য বহু কাঙ্ক্ষিত বইটি খুঁজতে থাকেন রত্ন ডুবুরিদের মতো। প্রতিটি স্টলই লেখক, পাঠক আর প্রকাশকদের উচ্ছ্বাস, আনন্দ, বেদনা, বিরহ, প্রেম-ভালোবাসায় হয়ে ওঠে মনোরমমুখর রাজ্য। পাঠকের একটা বড় সুবিধা হচ্ছে সব প্রধান লেখক-প্রকাশকদের বইগুলো বইমেলাতে পাওয়া যায়। এমনকি তাদের সাক্ষাত্ বা অটোগ্রাফও পাওয়া যায়, যা অন্য সময় মেলা দুষ্কর।
বইমেলা যে শুধু জ্ঞানই বিলিয়ে দেয় তা নয়, এখানে মানুষ প্রশান্তির পরশে প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাব বিনিময়ে নিজেকে উজাড় করে দেয়। নতুন প্রজন্মের মননে জাগ্রত হয় জ্ঞান আহরণের স্পৃহাসহ বইয়ের প্রতি মমত্ববোধ। খুদে পাঠক থেকে শুরু করে তরুণ, প্রবীণ সব বয়সের পাঠকদের উপস্থিতি এক অন্যরকম সম্প্রীতির সম্ভারে গেঁথে দেয় বাঙালি জাতিসত্তাকে। অমর একুশে বইমেলাতে অনেক বিদেশি লেখকদেরও আগমন ঘটে। বান্ধবের বন্ধন দৃঢ় করার উত্সও এই বইমেলা। যে বন্ধু বা আত্মীয়ের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা বা কথা হয়, বইমেলাতে তাকেও হয়তো নির্মল পরিবেশে পাওয়া যায়। মজবুত হয় হূদয়ের বন্ধন। এ জন্যই বইমেলাকে মিলনমেলাও বলা যায়।
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প প্রধানত বইমেলাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। বইমেলার অনুপ্রেরণাতেই অনেক নতুন লেখকের আবির্ভাব ঘটছে। নবীন লেখকদের লেখায় উঠে আসছে সাহিত্যের বিষয়বস্তু ও প্রকরণগত নতুনত্ব। তথ্য ও প্রযুক্তির যুগে তরুণ লেখকেরাই নতুনত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে দেশপ্রেমের প্রত্যয় নিয়ে বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে—এমনটিই বিশ্বাস।
করোনা মহামারির জন্য এবার চিরাচরিত অমর একুশে বইমেলাতে এসেছে বৈচিত্র্য। ভাষার মাস বলে অভিহিত ফেব্রুয়ারিতে এবার বইমেলা হলো না। ১৮ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে অমর একুশে বইমেলা। অর্থাত্ বাঙালির আরেক জাতীয় উত্সব ১লা বৈশাখ পর্যন্ত মেলা চলবে। মাঝখানে যুক্ত হবে ২৬শে মার্চের মহান ‘স্বাধীনতা দিবস’। আজ ১৮ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন করবেন। এ বছরের বইমেলায় বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ লটারির মাধ্যমে ৩১টি প্যাভিলিয়ানসহ ছোট-বড় সব মিলিয়ে ৮০৮টি স্টল বরাদ্দ দিয়েছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৬টি স্টল এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৬০২টি স্টল বরাদ্দ পেয়েছে।
২০২১ সালের অমর একুশে বইমেলা আমাদের প্রাণের গভীরে বয়ে আনবে আনন্দ উদ্বেলিত জ্ঞানের জোয়ার, মেলার প্রাঙ্গণে জমবে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান নানা বিষয়সহ বাঙালির জ্ঞানের বা প্রাণের আকাঙ্ক্ষা! করোনা মহামারির ক্লান্তি মুছিয়ে প্রাণের এই মেলা বাঙালির মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির স্রোতধারাকে করে তুলবে বেগবান, বই আর বইমেলা বাঙালির মননে ছড়িয়ে দেবে মানবিকতা ও সততার আলো—এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ইত্তেফাক/এএএম
