কণ্ঠহারা রিজেন্ট হানিইটার বলিয়া দেয় অনেক কথা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২১, ২১:২৬

কবি বলিয়াছেন—‘একবার ভেবে দেখ ভেবে দেখ মন/ পৃথিবীতে পাখি কেন গায়।’ পাখি কেন গান গায়—ইহার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই দিয়াছেন। কিন্তু কোনো এক প্রজাতির পাখি যদি গান গাওয়া ভুলিয়া যায়—তাহা হইলে কী দুর্দশা হইবে সেই পাখি প্রজাতিটির? তেমনই একটি ঘটনা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসিয়াছে। গান ভুলিয়া যাওয়া পাখিটির নাম রিজেন্ট হানিইটার। উহারা ছিল গায়ক পাখি। কিন্তু এখন উহারা গান ভুলিয়া যাইতেছে। একই সঙ্গে বিপন্নও হইয়া পড়িয়াছে। গান ভুলিয়া যাইবার জন্য বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে, নাকি বিপন্ন হইবার কারণে গান ভুলিয়া যাইতেছে—ইহা লইয়াও আরো গবেষণা হইতে পারে। পাখিরা কেন গান ভুলিয়া যাইবে? এই প্রশ্নে পরিবেশ-প্রতিবেশের বিপন্নতার কথাই সকলের প্রথমে আসিবে। সেই দিকে ব্যাখ্যা করিবার মতো অনেক কিছুই রহিয়াছে। সুতরাং আমরা সেই দিকে না গেলাম। আমরা বরং বুঝিয়া দেখিতে পারি, একটি প্রজাতি মূক হইয়া গেলে, কথা বলিতে ভুলিয়া গেলে কীভাবে তাহারা বিপন্ন হইয়া পড়ে। এই দিকটি নিঃসন্দেহে তাত্পর্যপূর্ণ। রিজেন্ট হানিইটার পাখির ক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে, উহারা একসময় দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল সংখ্যায় বসবাস করিলেও এখন মাত্র তিন শতের ঘরে নামিয়া আসিয়াছে। সুতরাং স্পষ্টভাবেই তাহারা এখন পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবার প্রহর গুনিতেছে।

তাহা হইলে সমীকরণটি এইরকম দাঁড়াইল, কেহ যখন কথা বলিতে ভুলিয়া যায় তখন তাহারা বিপন্ন হইয়া পড়ে। কিংবা বলা যায়, বিপন্ন হইয়া পড়িলে কথা বলা ভুলিয়া যাইতে হয়। আর তখন তাহাদের বিলীন হইয়া যাওয়াটাও কেহ আটকাইতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলিয়াছেন—‘মধ্যদিনে যবে গান বন্ধ করে পাখি,/ হে রাখাল, বেণু তব বাজাও একাকী।’ তাহাই তো! পাখি গান বন্ধ করিলে রাখাল তো বেণু বাজাইতেই পারে। কিন্তু এই বেণু বাজাইবার মতো রাখাল তো থাকিতে হইবে। নইলে কবির কথা অনুযায়ী মধ্যদিনেই নামিয়া আসিবে শ্মশানের নীরবতা। আমরা বুঝিতে চেষ্টা করি, পাখি তাহার মুখের ভাষা, গান, কলরব, কুজন ভুলিয়া গেলে কী সমস্যা হয়। বিজ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন, পাখিরা তাহাদের কুজন কিংবা গানের মাধ্যমে তথ্যের আদানপ্রদান করিয়া থাকে। ইহার মধ্যে রহিয়াছে বিপত্সংকেত, অনুরাগ, প্রেম এবং বংশবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা। পাখিরা বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ শব্দ করিয়া থাকে। এখন আমরা খুব সহজেই বুঝিতে পারি, কুজন কিংবা গানের মাধ্যমে পাখিরা যেইভাবে নিজেদের টিকাইয়া রাখে, সেই পাখিরাই যদি মূক হইয়া পড়ে, গান গাইতে ভুলিয়া যায়, তাহা হইলে তাহাদের অবস্থা রিজেন্ট হানিইটারের মতো হইবেই।

মানবজীবনও কি একই রকম নহে? কোনো জাতি যদি তাহার কথা বলিবার ক্ষমতা হারাইয়া ফেলে, তবে তাহারা কি ক্রমশ বিপন্ন হইয়া পড়িবে না? কিংবা উলটা করিয়া বলিতে পারি, কোনো জাতি যদি অন্তঃসলিলার মতো তলে তলে বিপন্ন হইয়া পড়ে তবে কি তাহারা কথা বলিবার ক্ষমতা ক্রমশ হারাইয়া ফেলে? রিজেন্ট হানিইটার আমাদের এইভাবে অনেক জিজ্ঞাসার মধ্যে ফেলিয়া দিতেছে। তবে এত কিছু না ভাবিয়া আমরা কবিগুরুর ‘অনন্ত জীবন’ কবিতার মতো বলিতে পারি—‘অধিক করি না আশা, কিসের বিষাদ/ জন্মেছি দুদিনের তরে,/ যাহা মনে আসে তাই আপনার মনে / গান গাই আনন্দের ভরে।’