একজন মওদুদ আহমদ

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২১, ২১:৩৪

আইনবিদ, রাজনীতিক ও লেখক—এই তিন পেশায় একসঙ্গে খ্যাতি অর্জন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে এই  তিন পেশায় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের অনন্যসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। তার এই সরব ভূমিকা কখনো তাকে নন্দিত, কখনো করেছে নিন্দিত। দেশে এই মিশ্র ভাবমূর্তি থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। অস্ট্রেলীয়-ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক জন পিলজার—নোয়াম চমস্কি যার কাজকে বলেছেন ‘অন্ধকারে আলোকসংকেত’, ২০০৮ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ এক নিবন্ধে তিনি তাকে চিত্রিত করেছেন ‘একজন ভদ্র ও সাহসী মানুষ হিসেবে।’

সেই ১৯৫৬ সালেই মওদুদ আহমদের সাহসের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি তখন কলেজের ছাত্র। ব্রিটিশরা যখন মিশরে আক্রমণ করেছিল, তখন তিনি ঢাকায় ব্রিটিশ কনস্যুলেটে ইউনিয়নের পতাকাটি নামানোর চেষ্টা করেছিলেন, এবং পুলিশের বেয়নেটের চার্জে তার ডানহাত মারাত্মক ভাবে আহত  হয়েছিল। এ কারণে কোনো কিছু লিখতে তার কষ্ট হতো। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই আঘাতের জন্য তিনি ভুগেছেন।

মওদুদ আহমেদের শুরুটা ১৯৫২ সালে। পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দু’ চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে একজন যুবকের রক্ত তার জামা ভিজিয়েছিল। স্কুলের ছাত্র মওদুদ ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেছেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনে তিনি অগ্রসরমাণ রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন। কৃতী শিক্ষাজীবনের অধিকারী ব্যারিস্টার মওদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান পাশ করে ব্রিটেনের লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে অর্জন করেন বার-অ্যাট-ল। দেশে ফিরে হাইকোর্টে ওকালতির একপর্যায়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন আইনি লড়াইয়ে। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আইনি লড়াই করতে খ্যাতনামা ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার টমাস উইলিয়ামস কিউসিকে বাংলাদেশে আনতে রেখেছিলেন মুখ্য ভূমিকা। ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান আহূত গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ সহকারী হিসেবে তার সঙ্গে ছিলেন। আন্তর্জাতিক জনমত আদায়ে মুক্তির সংগ্রামকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং তাদের বিফ্রিংয়ে অংশ নিতেন তিনি। পিলজার তখন গ্রানাডার টিভির হয়ে সংবাদ সংগ্রহে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে মওদুদ আহমদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালের অন্ধকার এক রাত। পাকিস্তানি সেনারা তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে যেসব গ্রামে ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল সেসব গ্রাম পার হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। আমাকে মোমবাতি হাতে নিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন মওদুদ আহমদ। তখন তিনি একজন যুবক আইনজীবী। তিনি পক্ষ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও তার পক্ষের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠকের ভূমিকা ছাড়াও ব্যারিস্টার মওদুদকে পোস্টমাস্টার জেনারেল নিয়োগ করে মুজিবনগর সরকার। তিনি প্রতিটি  দায়িত্বই সফলতার সঙ্গে পালন করেন।’

বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাস জুড়ে তার উপস্থিতি ব্যাপক। পেশাজীবী হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মানবাধিকার আইনজীবী, শিক্ষক, লেখক, রাজনীতিবিদ এবং একজন বিশিষ্ট পার্লামেন্টেরিয়ান হিসেবে তিনি সব সময়ই সরব ভূমিকায় ছিলেন। মওদুদের অনেক ভূমিকা নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করতে পারেন কিন্তু বাংলাদেশের তার ভূমিকাকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। জিয়াউর রহমান, এইচ এম এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন তিন সরকারের আমলেই ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপি আর জাতীয় পার্টি গঠনে পালন করেছেন মুখ্য ভূমিকা। কারাভোগ করেছেন পাকিস্তান আমল, বঙ্গবন্ধু, এরশাদ, ওয়ান-ইলেভেন, মহাজোট ও বর্তমান সরকারের আমলে।

মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে একটাই বড় অভিযোগ—তিনি বারবার দল বদল করেছেন। দলবদল করলেও মওদুদ আদর্শের বদল কখনো করেননি। তার আদর্শ নিয়ে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে কিন্তু গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের যে দর্শন তা থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি। এরশাদের সামরিক শাসনের শুরুতে তিনি তার শরিক ছিলেন না। ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন আর মওদুদ যোগ দেন ১৯৮৫ সালে। বরং এরশাদের সামরিক শাসনে তিনি নির্যাতিত হয়েছিলেন।

মওদুদ বিচারপতি সাত্তার সরকারে ছিলেন না। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভা থেকেও তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তার পরও এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর মওদুদকে গ্রেফতার করেছিলেন। দুর্নীতির দায়ে সামরিক আদালতে তার ১০ বছরের সাজা হয়। জেলে শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপে রেখে এরশাদ তাকে দলে ভেড়ান। যদিও মওদুদ আহমদ লিখেছেন, সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি এরশাদের দলে যোগ দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে মওদুদ বিএনপিতে ফিরে আসেন, যখন বিএনপি বিরোধী দলে।

মওদুদ আহমদের কর্মময় জীবনের প্রথম পরিচয় তিনি একজন আইনজীবী। আইনজীবী হিসেবে তার শুরুটাও ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৬৯ সালে কথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’ অভিযুক্তদের পক্ষে যেসব আইনজীবী ছিলেন তিনি তাদের একজন। দেশ স্বাধীনের পর মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে অসমান্য লড়াই করেন। মওদুদ আহমদ শান্ত এবং ধীরস্থিরভাবে আদালতে মামলা উপস্থাপন করতেন। তার যুক্তি ছিল তীক্ষ। এ কারণে আদালত অঙ্গনে তিনি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

রাজনীতিবিদ মওদুদের প্রচুর সমালোচনা থাকলেও লেখক মওদুদ আহমদ সব সময়ই প্রশংসিত। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে একাধিক গ্রন্থে তিনি বিএনপির নানা ব্যর্থতার নির্মোহ সমালোচনা করেছেন। যতবার জেলে গিয়েছেন বের হয়েই প্রকাশ করেছেন একাধিক গ্রন্থ। জেলখানার একাকিত্বকে তিনি বই লিখে উপভোগ করেছেন।

তার রচিত ১২টির মধ্যে অন্তত পাঁচটি বই আছে যার মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ বছরের রাজনীতির ইতিহাসের চিত্র পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর আলী রীয়াজ লিখেছেন, ‘মওদুদ আহমদ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবেন তা হচ্ছে—বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে তার গবেষণালব্ধ বইগুলো। বাংলাদেশের আর কোনো রাজনীতিবিদ এতটা নিষ্ঠার সঙ্গে এবং এতটা নৈর্ব্যক্তিকভাবে রাজনীতির বিশ্লেষণ করেছেন কি না, সেটা আমার জানা নেই।’ রাজনীতিক, আইনবিদ ও লেখক সত্তার বাইরে তিনি একজন শিক্ষকও। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন এলিজাবেথ হাউজ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফায়ার্স, ফেয়ারব্যাংক এশিয়া সেন্টার এবং হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান ইনস্টিটিউটের ফেলো। তিনি জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এলিয়ট স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফায়ার্সের ভিজিটিং প্রফেসর। মওদুদ আহমদ একই সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট পার্লামেন্টিরিয়ান১১। আওয়ামী লীগের তিন আমল ছাড়া ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি সবগুলো সংসদে ছিলেন। ১৯৮৬ সালের সংসদে তিনি সংসদ নেতার দায়িত্ব পালন করেন। তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে অনেকেই অপমানজনক কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি কোনোদিনই কারো সম্পর্কে কোনো কটু কথা বলেননি। তিনি রাজনীতিতে ভদ্রতা, সভ্যতা এবং অন্যরকম এক সংস্কৃতি লালন করতেন। ব্যারিস্টার মওদুদকে খণ্ডিতভাবে বিচার করলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। তার ত্রুটিবিচ্যুতি এবং সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মঙ্গলময় ভবিষ্যত্ এবং সমৃদ্ধি পথে তিনি তার প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করে গেছেন।

মওদুদ আহমদ বেঁচে থাকবেন তার কর্ম এবং সৃষ্টিতে।

n লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক