দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আবারও বেড়ে গেছে। গত মাসে যেখানে সংক্রমণের হার তিনের নিচে নেমে গিয়েছিল, সেখানে এখন তা বেড়ে দশের কাছাকাছি। আশঙ্কা করা হচ্ছে এভাবে চললে সামনের দিনগুলোতে এই সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরো বাড়বে। আমাদের জনগণের এক বিরাট অংশ এখন আর আগের মতো করোনা প্রতিরোধের স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানছে না। শহরে মাস্ক পরার হার বেশ কমে গেছে এবং গ্রাম এলাকাগুলোতে মাস্ক প্রায় অদৃশ্য। ঘন ঘন হাত ধোয়ার নিয়মটাও এখন আর তেমনভাবে মানা হচ্ছে না। জনসমাগমের জায়গাগুলোতে না যাওয়া অর্থাত্ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য বিজ্ঞানীরা বারবার অনুরোধ করার পরেও আমাদের দেশের মানুষজন যেন ভিড়কেই বেশি পছন্দ করছে। আমাদের বাস-ট্রেন লঞ্চগুলোও করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে গেছে অর্থাত্ আগে যেমন সেখানে গাদাগাদি ভিড় থাকত, এখন আবার তা-ই। মাঝে গত বছর করোনা ভাইরাসের মহামারি শুরুর পর একে কিছুটা সমীহ করে তারা যাত্রী কিছুটা কম নিত, মাঝখানের একটা সিট ফাঁকা রাখত, কিন্তু এখন আর সে বালাই নেই। বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড় দেখে কেউ বলবে না যে, দেশে একটা মহামারি চলছে। কক্সবাজার কুয়াকাটা থেকে শুরু করে বিনোদনকেন্দ্রগুলোর কোথাও হোটেলের সিট ফাঁকা নেই। ফলে এত লোকের স্থান সংকুলানের জন্য সীমিত জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন দেশে ঈদ এসেছে এবং অবাক ব্যাপার, এই বেড়ানোর মহোত্সবটিতে শিক্ষিত-সচ্ছল মানুষদের সংখ্যাই বেশি।
মহামারি চলাকালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার বিষয়ে এই গাছাড়া ভাব কেন, তার উত্তরে অনেকেই বলছেন তারা টিকা নিয়েছেন। কিন্তু এই উত্তর গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ বাংলাদেশে এখনো টিকা সবার জন্য উন্মুক্ত হয়নি। তাছাড়া কোনো বিজ্ঞানী বা টিকার উত্পাদক বলেননি যে, এক ডোজ টিকা নিলেই শরীরে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যাবে। বাস্তবতা হলো দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেওয়ার পর তৃতীয় সপ্তাহ পার হলে এরপর শরীরে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা মোটামুটি একটা সন্তোষজনক অবস্থায় আসে, তবে এক মাস পরে হলে আরো ভালো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) গবেষণা করেই বলছে যে, এরপর মাস্ক না পরলেও তেমন ক্ষতি নেই। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা এসব কী শুরু করেছি?
মহামারি ঠেকাতে বিজ্ঞানের মত অনুযায়ী যা যা করা দরকার তার মধ্যে রয়েছে—প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পরেও সতর্কতা হিসেবে মাস্ক পরতে হবে, হাত পরিষ্কার করতে হবে, মুখে অর্থাত্ নাকে, ঠোঁটে ও চোখে হাত দেওয়া যাবে না, একজন থেকে আরেক জনের দূরত্ব বজায় রাখতে হবে অর্থাত্ ভিড় পরিহার করতে হবে, ধাক্কাধাক্কি করা যাবে না, পাশাপাশি বসা বা দাঁড়ানো যাবে না, লিফটে উঠলে মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে বিপরীতমুখী দাঁড়াতে হবে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকলে ঠান্ডা বাতাসকে পুনঃসঞ্চালন বা রিসার্কুলেশন করা যাবে না, ঘরে ফ্যান চালালে যাতে বাইরের বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে এবং ভেতরের বাতাস বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে অর্থাত্ ভেন্টিলেশন থাকে, সেজন্য দরজা ও জানালা ভালো করে খুলে রাখতে হবে, টাকা গুনতে জিবের লালা দিয়ে আঙুল ভিজিয়ে তা করা যাবে না, গোনার পর সাবান-পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে, বাইরের কাপড় ও জুতা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করার আগে সেগুলো বদল করতে হবে ইত্যাদি।
আরো আছে যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা ভিড় পরিহারের জন্য ভিড়াক্রান্ত বাস-ট্রেন লঞ্চে ওঠা যাবে না। এটা অবশ্য আমাদের দেশে যানবাহন সংকটের কারণে অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে গত বছর করোনা আক্রমণের শুরুতে কিন্তু সবাই মিলে এটাকে অনেকটাই সম্ভব করে তুলেছিল। এখন গাছাড়া ভাবের কারণে সেটুকুও আর নেই। অনেক মানুষকে সহজেই সংক্রমিত করার জন্য এই রকম ভিড়াক্রান্ত যানবাহনগুলো বড় ভূমিকা রাখছে।
আমাদের দেশে অন্যগুলোর কথা বাদ দিয়ে শুধু আমাদের অভিজাত এলাকার রেস্টুরেন্টগুলোর কথাই যদি বলি, সেগুলোতে যতক্ষণ খুশি আড্ডা দেওয়া যায়। মাঝরাত পার হয়ে গেলেও আড্ডার কারণে সেগুলো বন্ধ হয় না, কিংবা বন্ধ হয় না বলেই আড্ডা চলতেই থাকে। সেখানকার খদ্দেরদের অনেকের আবার সন্ধ্যাই শুরু হয় রাত ১০টার পর। ফলে তাদের আহার ও আড্ডা সারতে মাঝরাত হওয়াই স্বাভাবিক। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের সব রেস্টুরেন্টের বেলাতেই জনস্বাস্থ্যগত বিধিগুলো মেনে তাদের পরিচালনার নিয়মনীতি ঠিক করা প্রয়োজন। নইলে করোনা সংক্রমণ ছড়াতে তারাও ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যে হয়তো রেখেছেও অনেকটা।
সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়মিত প্রথাগত ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা অত্যন্ত যৌক্তিক। জনস্বাস্থ্যগত বিবেচনায় এটাই হওয়া উচিত। করোনার কারণে আমাদের শিক্ষাজীবন অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহামারিতে তা হয়। এটা দুঃখজনক। কিন্তু এখন মহামারি ঠেকানোই বড় কাজ। কারণ বেঁচে থাকলে আমরা ভবিষ্যতে এগুলো করার সুযোগ ও সুন্দর পরিবেশ পাব। ততদিন আমাদের সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। শিক্ষায়তনগুলো খোলা রাখলে আমাদের সন্তানরা ও শিক্ষকমণ্ডলী অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে থাকবেন এবং সংক্রমণ অনেক বেড়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
অবাক লাগে, যখন কেউ কেউ সিনেমা হলগুলোও খুলে দেওয়ার কথা বলেন। বিনোদন ও বিনোদন ব্যবসায়ের নাকি এতে বিশাল ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। তারা কি আসলেই মহামারি ও তার সংক্রমণের গতিধারা সম্পর্কে জানেন? মহামারির চাইতেও এখন বিনোদন কি প্রধান সমস্যা? যদি ব্যবসায়ই এরকম দাবির কারণ হয়ে থাকে, তাহলে বিবেচনায় নিতে অনুরোধ জানাই যে, মানুষ বাঁচলে ভবিষ্যতে ব্যবসায়ের অনেক সুযোগ পাবেন।
ওয়াজ মাহফিলগুলো সামাজিক দূরত্ব মেনে এবং মাস্ক পরে ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে করা হলে ঝুঁকি অনেক কমবে। নইলে এখন যেভাবে অসংখ্য ওয়াজ মাহফিল হচ্ছে তাতে সংক্রমণের হার কমানো সরকারের জন্য দুঃসাধ্য হবে। সমাজে শৃঙ্খলার জন্য ধর্মপালন ও ওয়াজ মাহফিলেরও নিশ্চয়ই প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু মহামারি যাতে বেড়ে না যায়, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সেভাবে এগুলো আয়োজন করা নিশ্চয়ই সম্ভব এবং আয়োজকদের সেটাই করা উচিত।
রাজনৈতিক সমাবেশগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধের নিয়মবিধি মোটেই মানা হচ্ছে না বলে অনেকেই অভিযোগ করছেন। প্রেস ক্লাবসহ অনেক জায়গাতে এই ঘটনাগুলো আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি ও তার চর্চা অবশ্যই দরকার। কিন্তু জাতির স্বার্থেই সেটা জনস্বাস্থ্যগত স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনেই করা উচিত। সরকার যেখানে মুজিববর্ষ পালনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানমালাকেই জনস্বার্থে চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছেন, সেখানে অন্যরা কোনো রকম স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যেভাবে খুশি চলবেন তা কোনো সভ্য সমাজেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পরিশেষে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকিয়ে জনগণকে রক্ষার জন্য যা সবচেয়ে জরুরি তা হলো টিকা নেওয়া। সুখের বিষয় যারা একসময় করোনার টিকাকে বুড়িগঙ্গার পানি বা মুরগির টিকা বলে জনগণকে টিকা না নিতে বলেছিলেন, তারাও এখন টিকা নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। টিকা দেওয়ার পদ্ধতিকে আরো সহজ ও ব্যাপক না করলে কাঙ্ক্ষিত হার্ড ইমিউনিটি পেতে অনেক সময় লেগে যাবে। যারা প্রথম ডোজের টিকা পাননি তাদেরকে টিকা দিতে হবে। উন্নত দেশেও এজন্য সামরিক বাহিনীর সাহায্য নেওয়া হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দিতে তাদেরকে সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও সহায়তার জন্য কাজে লাগানো যায় কি না ভেবে দেখা দরকার। যাদের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার সময় হয়েছে তারা যেন সময়মতো টিকা নেন তাও নিশ্চিত করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, এই ভাইরাস কিছুদিন পরপর মিউটেশন করবেই অর্থাত্ নিজেদের রূপান্তর ঘটাবেই। এটাই নিয়ম। এই রূপান্তরের ফলে কখনো কম বা কখনো বেশি ক্ষতিকর ভাইরাসের জন্ম হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃতির নিয়মে কম ক্ষতিকর ভাইরাসেরই উদ্ভব ঘটে। তবে মাঝেমধ্যে বেশি ক্ষতিকর ভাইরাসের উদ্ভব হয়। পৃথিবীতে গত বছর করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বার এর মিউটেশন হয়েছে। ভাগ্যিস, এর সবগুলোই তেমন ক্ষতিকর নয়। এখন পৃথিবীতে যে তিনটি রূপান্তর বা ভেরিয়েন্ট সবচেয়ে ক্ষতিকর বলে আবির্ভূত হয়েছে সেগুলো হলো যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের ভেরিয়েন্ট। আমাদের দেশে এখন যে সংক্রমণ অনেক বেড়ে গেছে তার জন্য আমাদের গাছাড়া ভাব, করোনা বিজয় করে ফেলেছি এমন বিশ্বাস, প্রথম ডোজ টিকা নিয়েই আমার কিছু হবে না এমন আত্মতুষ্টির পাশাপাশি ক্ষতিকর ভেরিয়েন্টও দায়ী। বলা যেতে পারে, আমাদের দোষেই এই ভেরিয়েন্টগুলো আমাদেরকে পেয়ে বসেছে। কিন্তু আমরা যদি স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলি এবং সবাই টিকা নিতে শুরু করি তাহলে এসব ভেরিয়েন্ট সুবিধা করতে পারবে না, তাদের মিউটেশনও ক্রমাগত কমতে থাকবে এবং একসময় আমরা করোনা মহামারিকে সত্যি সত্যি পরাজিত করতে পারব।
তাই এখন যে ভেরিয়েন্টরূপী ‘রাক্ষসগুলো’ আমাদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নিজে টিকা নিতে হবে, টিকা নিতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং সবগুলো স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এই হচ্ছে এই ‘রাক্ষসগুলো’ সংহারের ‘প্রাণভোমরা’। এই প্রাণভোমরাগুলো আমাদেরই হাতে। আমরা যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই তাহলে সত্যি সত্যিই করোনাকে, তার সব ভেরিয়েন্টসহ নির্মূল করতে পারব। নইলে যতই হাহাকার করি না কেন, কখনোই তা পারব না, এটাই বাস্তব।
n লেখক : পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার; সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
