প্রকাশ ঘোষ বিধান
সুন্দরবনে বাঘে মানুষে লড়াই চলে! একটু অসাবধান হলেই বাঘের হামলার শিকার হন বনজীবী ও মত্স্যজীবীরা। জীবন-জীবিকার তাগিদে বেশিরভাগ মানুষ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। দরিদ্র মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় প্রাণের মায়া ত্যাগ করে জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ আর বনদস্যু ও জলদস্যুদের অত্যাচারের ভয় উপেক্ষা করে সুন্দরবনে যায়। নদীতে মাছ, কাঁকড়া, বনে কাঠ, মধু সংগ্রহ করে মূলত তারা জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। সুন্দরবনের বাঘের আক্রমণে মৃত্যু হচ্ছে অনেক বনজীবী, মত্স্যজীবী, মাওয়ালী ও বাওয়ালীর।
প্রতি বছর কিছু মানুষ বাঘের শিকার হচ্ছে আবার কিছু মানুষ লড়াই করে বাঘের মুখ থেকে জীবন বাঁচিয়ে ফিরছে। সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে এমন বাঘে ধরা মানুষ দেখা যায়। এদের মধ্যে কেউ কেউ দুইবার বাঘের মুখে পড়েও বেঁচে ফিরেছে। এমন বাঘে আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাঘের হামলায় ক্ষত-বিক্ষত শরীর, বিকৃত চেহারা, মানসিক ভারসাম্যহীনভাবে তাদের বেঁচে থাকা। এ যেন এক অভিশপ্ত জীবন।
বাঘ সামনাসামনি আক্রমণ করে না। চুপি চুপি আড়াল থেকে মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঝোপের পিছন থেকে আচমকাই বেরিয়ে আসে বাঘ। তার ভয়ংকর প্রবল গর্জন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তে ঝাঁপ দেয় বাঘ। বাঘ প্রথমে থাবা মেরে মানুষকে মাটিতে ফেলার চেষ্টা করে। বাঘের সামনের দুই পায়ের থাবায় পাঁচটি করে প্রখর ধারালো লম্বা নখ আছে। থাবা মেরে মাংস ছিঁড়ে ফেলে। শিকার ধরার সময় বাঘ প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে সামনের পা দুটি ব্যবহার করে। প্রথমে বাঘ মাথায় আক্রমণ করে। দাঁত বসাতে চেষ্টা করে কামড়ে কামড়ে। এ সময় বাঘের মুখ থেকে প্রচুর লালা ঝরতে থাকে। দাঁত বসানোর আগ পর্যন্ত মানুষ বাঘের সঙ্গে লড়াই করতে পারে। মাথা, গলা কামড়ে ধরলে আর কিছু করার থাকে না। নিশ্চিত মৃত্যু।
বাঘের আক্রমণ থেকে উদ্ধার পেয়ে চিকিত্সায় শরীরের অন্যান্য ক্ষত সেরে উঠলেও মনের ক্ষত থেকে আর সেরে ওঠে না। সারা জীবন তাড়া করে ফেরে। মাথায় আক্রমণে যে স্নায়ুবিক ক্ষতি হয়, সেটা তাকে বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। তার ওপর আছে মানসিক ট্রমা। মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার ভয়ংকর স্মৃতি কখনোই তার পিছু ছাড়ে না। যে কোনো কিছুতে সামান্য শব্দ হলে মন কেঁপে ওঠে। মাঝ রাতে আতঙ্কে চিত্কার করে ওঠে অনেকে। বাড়ির পোষা গরু, ছাগল, বলদ যদি পিছন থেকে গায়ে ঘষা দেয় বা আপনজন ও সন্তান জড়িয়ে ধরে তাতেও কেউ কেউ আর্তনাদ করে ওঠে। বাঘে আক্রান্ত প্রায় ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে থাকে বিকারগ্রস্ত। হিসাব মেলাতে না পারা, সময়জ্ঞান নষ্ট হয়ে হয়ে যাওয়াসহ শারীরিক দুর্বলতা, দৈনন্দিন কাজকর্মে মন না বসা—এ এক দুর্বিষহ জীবন।
বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—এক দশক আগে প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ জন মানুষ বাঘের আক্রমণে মারা যেত। এদের অধিকাংশ বাওয়ালী, জেলে, মৌয়ালী ও জ্বালানি কাঠ আহরণকারী। সরকার বন্যপ্রাণী দ্বারা নিহত বা আহত মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে এবং এর আলোকে ২০১১ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
বাঘে আক্রান্ত মানুষ সম্পর্কে উদাসীনতা লক্ষণীয়। তাদের অপয়া হিসেবে দেখা হয়। বাঘের আক্রমণে বেঁচে যাওয়া অথবা বাঘের হাতে মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিবারের পুনর্বাসন জরুরি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সুন্দরবনের প্রতিবেশচক্রের পরিবর্তন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, হরিণ পাচার ও শিকার এবং খাদ্য সংকটসহ বিবিধ কারণে বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে বাঘ-মানুষের সংঘাত নিরসনে গণসচেতনতা সৃষ্টি, প্রশিক্ষণ প্রদান ও সময় উপযোগী বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খুলনা
