জি এম আরিফ
কৃষি ফসল যাতে নষ্ট না হয় বা পোকামাকড়ে যাতে আক্রমণ না করে তার জন্য ব্যবহার করা হয় বালাইনাশক, যা মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করতে গিয়ে ফসলের উপকারী পোকামাকড়ও ধ্বংস হচ্ছে। কীটনাশকের কারণে বহু বিল, হাওর মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। বহু প্রজাতির পাখি অদৃশ্য হয়ে গেছে। ফসল রক্ষাকারী পোকামাকড় ধ্বংসের কারণে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হচ্ছে!
কৃষিজমি বিশেষ করে ধানের জমিতে একসময় শামুক-ঝিনুক ও ছোট মাছ দেখা যেত। এখন এগুলো একেবারেই অনুপস্থিত। প্রকৃতির লাঙ্গল বলা হয় যে কেঁচোকে তাও এখন আর কৃষিজমিতে পাওয়া যায় না। ফসলের জমিতে পোকামাকড় খাওয়ার জন্য পাখপাখালির বিচরণ এখন কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। ফসলের মাঠে ফুল থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত ভ্রমর আর মৌমাছির গুঞ্জনও কমে গেছে নানা রকম বিষাক্ততায়। এছাড়াও কৃষি পরিবেশে বিদ্যমান নানা রকম সরীসৃপ আজ বিলুপ্তপ্রায়।
মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে জমির গুণাগুণ যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি কমে যাচ্ছে জমির উর্বরতা। আবার জমিতে ব্যবহূত এইসব বালাইনাশক বন্যার পানিতে মিশে চলে যায় খাল-বিল-জলাশয় বা বিভিন্ন নদ-নদীতে। ফলে এইসব পানি ক্রমেই বিষাক্ত বা দূষিত হচ্ছে, এতে মারা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। আবার এইসব বিষাক্ত পানি ব্যবহার অযোগ্য এবং তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নানান ধরনের রোগজীবাণু সৃষ্টি করছে।
আগের মতো বিলে-ঝিলে মাছ পাওয়া যায় না এবং সামান্য কিছু মাছ পাওয়া গেলেও আগের মতো স্বাদ পাওয়া যায় না—তার একমাত্র কারণ বালাইনাশক। আবার খাল-বিলের পানিতে এখন মাছ খুব একটা বড় হয় না এবং আগের মতো সব ধরনের দেশীয় মাছ পাওয়া যায় না। বর্তমানে বাজারে সব চাষের মাছ পাওয়া যায়—এগুলোর পুষ্টিগুণ একেবারেই নেই। দেশীয় মাছের বৃহত্তম উত্স নদী-নানা-খাল-বিলে এখন প্রাকৃতিকভাবে মাছ খুব কম হয়, এর প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশকের ব্যবহার।
বালাইনাশক সহজলভ্য এবং কম দাম। ফলে কৃষক ফসল বাঁচাতে কিংবা টাটকা রাখতে অবাধে ব্যবহার করছেন বালাইনাশক। মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষককে উত্সাহিত এবং অনেক সময় বিনামূল্যে সরবরাহ করছেন। অথচ এইসব বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কৃষকদের অবহিত করে প্রাকৃতিক উপায়ে বালাইনাশক তৈরিতে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে। কৃষকের ফসল উত্পাদনে কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে, যাতে তাঁরা প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল পেতে পারেন।
পরিশেষে, সব ধরনের বালাইনাশকের উত্পাদন, বিপণন ও বিক্রিতে তদারকি বাড়িয়ে যততত্র এইসব বিক্রি বন্ধ করতে হবে। বালাইনাশক ছাড়াও সুন্দর ও পুষ্টিকর ফসল উত্পাদন সম্ভব। ফসল বাঁচাতে হাজার হাজার জীব ও প্রাণীর জীবন বিপন্ন হওয়াসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত এবং পরিবেশের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এটা কাম্য নয়।
ফেনী
০
