১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (১৯ মার্চ)

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২১, ২২:২৪

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র।  বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রধান খবরের শিরোনাম করা হয়, ‘এ গণবিস্ফোরণ মেশিনগানেও স্তব্ধ করা যাইবে না’। পাশে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তর্জনী ওঠানো একটি স্থিরচিত্র। তার ওপর ‘আমি শেখ মুজিব বলছি’ উল্লেখ করে ইত্তেফাক জানিয়েছে মূল প্রতিবেদনের শিরোনামটি কার কথা।

দৈনিক ইত্তেফাকের ১৯ মার্চের প্রধান খবরে জানানো হয়, ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন এখন মুক্তিকামী জনতার তীর্থক্ষেত্র। স্বাধীনকারকামী বাংলার মানুষের অসহযোগ আন্দোলনের ধারাক্রমে আবাল-বৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে সমাজের সবপর্যায়ের মানুষের যেন ঢল নেমেছে।

জাতীয় জীবনের বর্তমান সংকট-সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্রপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া ও জাতীয় নেতা শেখ মুজিবের মধ্যে দুই-দফা বৈঠকের পর তৃতীয় বৈঠকের কোনো সময় ধার্য না হওয়ায় গণমনে কিছুটা জিজ্ঞাসা জাগায় গতকাল (১৯৭১ সালের ১৮ মার্চ) ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উৎসুক জনতা ভিড় জমাতে থাকে বাড়িটিতে। শপথদীপ্ত ছাত্র, যুবক, নার্স, ব্যাংককর্মী, নার্সিং স্কুল ও কলেজের ছাত্রী, ট্রাকচালকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের সংগ্রামী মানুষের মিছিল এসে নেতার প্রতি অকুণ্ঠ আস্থা জ্ঞাপন করে প্রতিদানে তার আশীর্বাদ কামনা করে।

সারাদিন ধরে আনাগোনাকারী বিদেশি সাংবাদিকদের দৃষ্টি এসব মিছিলের প্রতি আকর্ষণ করে একপর্যায়ে আবেগভরা কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিদেশি বন্ধুরা, দেখুন। ভোর ৫টা থেকে রাত পর্যন্ত আপনারা শুধু এই দৃশ্যই দেখতে পাবেন। আমার দেশের মানুষ আজ প্রতিজ্ঞায় কী অটল, সংগ্রাম আর ত্যাগের মন্ত্রে কত উজ্জীবিত, কার সাধ্য তাদের রোখে?’

শেখ মুজিবের কথায়, ‘আমার দেশ আজ জেগেছে, জনগণ জেগেছে, জীবন দিতে শিখেছে। স্বাধীনতার জন্য জীবনদানের অগ্নিশপথে দীপ্ত জাগ্রত জনতার এ জীবন জোয়ারকে, প্রচণ্ড এ গণবিস্ফোরণকে স্তব্ধ করতে পারে এমন শক্তি মেশিনগানেরও আজ নাই।’

স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলার মানুষ তোমরা ঘরে ঘরে সংগ্রামের দুর্গ গড়ে তোলো। আঘাত যদি আসে প্রতিহত করো, পাল্টা আঘাত হানো। ৭ কোটি শোষিত-বঞ্চিত বাঙালির সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। চরম ত্যাগের বিনিময়ে হলেও আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাবোই। দরকার হলে রক্ত দিয়েই আমরা দাবি প্রতিষ্ঠা করবো। তবু শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না।’ 

ইত্তেফাক/জেএইচ