বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২১, ২০:৪২

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, (১৮৩৮-১৮৯৪)  ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান পুরুষ।

 

জন্ম:১৮৩৮ সালের ২৭ জুন চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁঠালপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম দিকে ছিলেন ব্রিটিশ  সরকারের একজন কর্মকর্তা, পরে হুগলির ডেপুটি কালেক্টর হন।

 

অর্জন:১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের যে দু’জন ছাত্র বিএ পাস করেন, বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন তাঁদের একজন।

 

কর্মজীবন:তিনি তাঁর পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিম্ননির্বাহী চাকরিতে (সাব-অর্ডিনেট এক্সিকিউটিভ সার্ভিস) যোগ দেন এবং পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে চাকরি করেন। উপনিবেশিক সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন।

 

স্বীকৃতি:ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে চাকরিতে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ১৮৯১ সালে ‘রায়বাহাদুর’ এবং ১৮৯৪ সালে ‘Companion of the Most Eminent Order of the Indian Empire’ (CMEOIE) উপাধি প্রদান করে।

 

সাহিত্যে অবদান ও গ্রন্থ:চারটি স্বতন্ত্র ধারা বঙ্কিমচন্দ্রের লেখক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পশ্চাতে চারটি স্বতন্ত্র ধারা ক্রিয়াশীল ছিল। প্রথমত উনিশ শতকের শুরুতে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষীর আধুনিক চিন্তাধারার ফলে বাংলা গদ্যের বিকাশ।

চব্বিশ পরগনা জেলার বারুইপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্টেট থাকা অবস্থায় বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রথম দুটি বিখ্যাত  উপন্যাস দূর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) ও কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬) রচনা করেন। উপন্যাস দুটি দ্রুত প্রচার লাভ করে। পরবর্তীতে ১৮৮৭ সালের মধ্যে তাঁর অন্যান্য গদ্য রচনাসহ মোট চৌদ্দটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়।

 

বাংলা উপন্যাস ও বাংলা গদ্য সাহিত্যের উত্কর্ষ সাধনে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পূর্বে বাংলা উপন্যাস বলতে যা বোঝাত তা ছিল কতিপয় সংস্কৃত নাটক ও গল্প এবং কিছু ফারসি ও আরবি গল্পের অনুবাদ এবং সেগুলি ছিল প্রধানত শিক্ষামূলক ও নীতিমূলক। সেসব উপন্যাসের মূল লক্ষ্য ছিল কাব্যচর্চা, প্রকৃতির পূঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, মানবীয় সৌন্দর্যের অযৌক্তিক উপস্থাপনা, অবিরাম কাল্পনিক ঘটনার বিবরণ এবং বিস্ময়কর ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ের বর্ণনা। রচনারীতি ও গদ্যশৈলীর দিক থেকে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নববাবু বিলাস (১৮২৩) এবং প্যারীচাঁদ মিত্রের  আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) ছিল আধুনিক সাহিত্যের ধারায় দুটি ব্যতিক্রমধর্মী রচনা। চরিত্রচিত্রণ, শিল্পসৃজন, বর্ণনা, নান্দনিকতা এবং সর্বোপরি বাংলা গদ্যের উত্কর্ষ সাধনে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিলেন এবং বাংলা সাহিত্যকে এমন একটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিকশিত হয়েছে বিশ শতকের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।

 

বাংলা সাময়িকী সাহিত্যের প্রসারেও বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান অসামান্য। তাঁর সম্পাদিত  বঙ্গদর্শন পত্রিকার মাধ্যমে একটি নতুন লেখকগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা সাময়িকী সাহিত্যের বিষয়বস্তু এবং রচনাশৈলীর দিক থেকে এক নতুন আদর্শ স্থাপন করেন। সমাচার দর্পণ, সংবাদ প্রভাকর, সম্বাদ কৌমুদী এবং তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা রচনাশৈলীর যে ধারা সৃষ্টি করেছিল, বঙ্কিমচন্দ্র তার পরিবর্তন করে ভিন্নধর্মী সমালোচনার ধারা সৃষ্টি করেন, যদিও অতীতের মতো ধর্মীয় আলোচনা ছিল এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। হিন্দুধর্ম সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা ‘কৃষ্ণচরিত’, ‘ধর্মতত্ত্ব’ ও ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ নামে মনোগ্রাফ আকারে ধারাবাহিকভাবে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। তবে এ থেকে এরূপ মনে করার কোনো অবকাশ নেই যে, বঙ্কিমচন্দ্র একজন হিন্দুধর্ম-প্রচারক ছিলেন। তাঁর সফল কয়েকটি উপন্যাস বঙ্গদর্শনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র ইউরোপীয় জার্নালের মতো সমালোচনার মঞ্চ হিসেবে বঙ্গদর্শনকে তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমসাময়িক অন্যান্য অনেক সাময়িকীর মতো বঙ্গদর্শনও খুব অল্প সময়, মাত্র চার বছর (১৮৭২-১৮৭৬) স্থায়ী হয়েছিল।