পরিকল্পিত হামলা, হোতা যুবলীগ নেতা গ্রেফতার

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২১, ২৩:০৭

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা-লুটপাট ও ভাঙচুর পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। এদিকে এই হামলার মূলহোতা মামলার প্রধান আসামি ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি শহিদুল ইসলাম ওরফে স্বাধীন মেম্বারকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে গ্রেফতার করেছে। পরে তাকে শাল্লা থানায় হস্তান্তর করা হয়।

পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ খালেদ উজ জামান জানান, শুক্রবার রাত ১টা ৩০ মিনিটে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত স্বাধীনসহ ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা সবাই কারাগারে। শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক জানান, গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে স্বাধীনকে হস্তান্তর করা হয়। তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবদেন করা হয়েছে। এর আগে বেলা ১১টার দিকে ব্যুরোর সিলেট কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন পিবিআইর পুলিশ সুপার খালেদ উজ জামান। তিনি জানান, শাল্লার হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যানের দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি এই স্বাধীন। ঘটনার পর থেকে তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিলেন। পিবিআইর বিশেষ টিম মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের বুড়াবুই গ্রাম থেকে তাকে গ্রফেতার করে। সে এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।

কে এই স্বাধীন?

স্বাধীনের বাড়ি শাল্লার পার্শ্ববর্তী দিরাই উপজেলার নাচনি গ্রামে। তিনি ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ও শ্যামারচর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। এই তথ্য দিয়েছেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার তোতা মিয়া ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার দুলাল আহমদসহ স্থানীয়রা। ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি আল হেলাল গতকাল রাতে ইত্তেফাককে জানান, স্বাধীন মিয়া বিভিন্ন সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পিআইসিতে কাজ করেছেন। দলের হয়ে অনেক প্রভাব খাটিয়েছেন। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রঞ্জন রায়ের সমর্থক হয়ে কাজ করেছেন। পরে তিনি নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম চৌধুরীর পক্ষে অবস্থান নেন। হেলাল আরো জানান, তার আত্মীয়স্বজনদের কেউ কেউ জামায়াত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

গত বুধবার হেফাজত নেতা মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে ঝুটন নামের এক যুবকের স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে নোয়াগাঁও গ্রামের ৮৮টি হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ঘটনার পর থেকেই হামলাকারী হিসেবে স্বাধীনের নাম উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, জলমহাল নিয়ে বিরোধের জের ধরে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় প্ররোচনা দেন স্বাধীন আর হামলায় অংশ নেন হেফাজত-সমর্থকরা।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে হবিবপুর ইউপি চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল প্রথম মামলা করেন। এই মামলায় ৭০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ১ হাজার ৫০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। এতে প্রধান আসামি করা হয় শহিদুল ইসলাম স্বাধীনকে। এছাড়া অন্য আরেকটি মামলা করেন শাল্লা থানার এসআই আব্দুল করিম।

হামলা পূর্বপরিকল্পিত, ষড়যন্ত্রের অংশ :কাদের

ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মনে করেন, এখন স্পষ্ট যে কারা নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট করেছে। এই হামলা ও লুটপাট পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ বলেও তিনি দাবি করেন। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকার সরকারি বাসভবনে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী আরো বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আনুষ্ঠানিকতায় কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করলে সমুচিত জবাব দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ প্রস্তুত রয়েছে। যারাই দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে চাইবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বিষ দাঁত ভেঙে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রধান মিত্র দেশ ভারত, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভারতের সরকার প্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বিশেষকে নয়। কাফন নিয়ে শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তির হুমকি ও নরেন্দ্র মোদির সফর প্রতিহত করার ঘোষণা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সেতুমন্ত্রী উগ্র সাম্প্রদায়িক এ অপশক্তিকে প্রতিহত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ-প্রশাসনের মতবিনিময়

সুনামগঞ্জ জেলার ইমাম-ওলামাগণ এবং ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গতকাল জেলা প্রশাসনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় হামলার ঘটনায় নিন্দা এবং ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানানো হয়। নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘ইসলাম শান্তির

 

ধর্ম।  সংখ্যালঘুর নিরাপত্তায় বিশ্বাসী। শাল্লার ঘটনাটি ইসলাম সমর্থন করে না। সুনামগঞ্জের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য পরিকল্পতিভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।’ সভায় উপস্থিত সবাই আজ রবিবার জামালগঞ্জে হেফাজত ইসলামের সম্মেলনটি বাতিল অথবা পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে এ  বিষয়ে সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন, মাওলানা আ. বছির, মাওলানা নূর উদ্দিন, মাওলানা আ.বছির, জেলা ইমাম মুয়াজ্জিম পরিষদের সভাপতি মাওলানা মুজিবুর রহমান, জেলা ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা ইদ্রিস আহমদ প্রমুখ।

পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘শাল্লার ঘটনায় কারো সঙ্গে কোনো বেআইনি আচরণ করা হবে না।  আমরা নিশ্চিত না হয়ে কাউকে গ্রেফতার বা হয়রানি করব না।’ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘শাল্লার ঘটনায় শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীতে তোলপাড় চলছে। তাই আপাতত কোনো জলসা বা সমাবেশ নয়। পরিবেশ শান্ত হলে সভা-সমাবেশ করা যাবে।’

নোয়াগাঁওয়ে বিএনপি প্রতিনিধি দল

কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নিতাই রায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত নোয়াগাঁও গ্রাম পরিদর্শন করে। এসময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে এক লাখ ২০ হাজার টাকা তুলে দেন তারা। এসময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী সদস্য নিপুণ রায়, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন প্রমুখ। অ্যাডভোকেট নিতাই রায় বলেন, ‘এই সরকার যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। তাদের আমলেই রামুতে হামলা হয়। এবার সুনামগঞ্জে হামলা হলো।’

ঢাবি শিক্ষক সমিতির বিবৃতি

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, সুনামগঞ্জের শাল্লায় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার মধ্য দিয়ে মামুনুল হকের (হেফাজত নেতা)  অনুসারীরা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ করেছে বলে মন্তব্য করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সংগঠনটি বলছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যখন বিদেশি অতিথিরা দেশে অবস্থান করছেন, তখন হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট করে মামুনুলের অনুসারীরা বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে একটি সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে, যা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ। সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক ড. মো. নিজামুল হক ভূইয়া স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল এ দাবি করা হয়।

‘স্বাধীন মিয়া যুবলীগের কেউ নয়’

স্বাধীন মিয়া যুবলীগের কেউ নয় বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক খায়রুল হুদা চপল। তিনি বলেন, যুবলীগ তার দায় নেবে না। গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জ পৌর শহরে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক খন্দকার মঞ্জুর আহমদ। এতে বলা হয়, ‘২০০৭ সালের পর থেকে দিরাই ও শাল্লায় যুবলীগের কোনো সংগঠনিক কমিটি নেই। তাই যারা শহিদুল ইসলামকে যুবলীগের নেতা বলে প্রচার করছেন, সেটা সঠিক নয়।’