ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামীম ফরহাদ, এনডিসি, পিএসসি
অধ্যক্ষ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ
প্রিয় পরীক্ষার্থীবৃন্দ, অনেক অপেক্ষা শেষে আর কয়েক মাস পরেই তোমাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। আজ আমি পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও পরীক্ষার হলে করণীয় সম্পর্কে সংক্ষেপে তোমাদের কিছু পরামর্শ দেব। কোভিড-১৯ এর কারণে শ্রেণিতে পাঠকর্মসূচি বন্ধ থাকায় তোমরা অনেকেই অন্যান্য বছরের মতো গতানুগতিক প্রস্তুতি নিতে পারনি। তারপরেও, অনলাইনে ক্লাস আর ঘরে বসে নিজস্ব নিয়মে পাঠের মাধ্যমে আশা করি সিলেবাস অনুযায়ী পড়া সবার শেষ হয়েছে। তোমাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ইতোমধ্যেই সরকার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ৬০ কর্মদিবস এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ৮০ কর্মদিবস পাঠদানপূর্বক সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হবে।
যেহেতু পরীক্ষা সন্নিকটে, সেহেতু এই সময়টুকু ুুহলো, তুমি এযাবত্ যা পড়েছ সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুযায়ী তা পুনঃপাঠের ও অনুশীলনের সময়। সামনে যেটুকু সময় আছে তার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করবে। রুটিন করে মূলপাঠ্যবই বারবার পড়বে। রিভিশন দিয়ে পড়াটাকে শেষবারের মত ঝালিয়ে নিবে। বিগত দিনের টেস্ট পেপারস থেকে প্রশ্ন বেছে নিয়ে তার উপর সময় ধরে বাসায় বসে পরীক্ষা দাও, এরপর উত্তরগুলো মিলিয়ে নাও। এতে তুমি তোমার প্রস্তুতির যথার্থ অবস্থা বুঝতে পারবে। এরপর নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা শুধরাতে চেষ্টা করবে। নিজের পরীক্ষা প্রস্তুতির উপর দৃঢ় আস্থা রাখতে হবে, অর্থাত্ আমি গত দুই বছরে যা পড়েছি তা সঠিকভাবে পড়েছি, দুইবছরে যত পরীক্ষা দিয়েছি আর যা প্রস্তুতি নিয়েছি তা নিয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী; এমন মনোভাব রাখতে হবে।
ইতোমধ্যেই তোমরা একাধিক পাবলিক পরীক্ষা দিয়েছ। আশাকরি এজন্য তোমাদের পরীক্ষাভীতি অনেকটাই কেটে গেছে। অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা তোমাদের রয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানের নতুন পরিবেশে পরীক্ষা দিবে, সিট কেমন জায়গায় পড়ল, অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা পরীক্ষায় কেমন গার্ড দিবেন; এসব ভেবে দুশ্চিন্তা করবে না। বিগত দুইবছরের অধিক সময়ে যা পড়েছ, সে আলোকে প্রশ্নের উত্তর করবে। অযথা টেনশন করো না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখো, তোমার পরীক্ষা ভালো হবে।
পরীক্ষার রুটিন ঘোষণার পর এর কপি সংগ্রহ করে তা তোমার পড়ার টেবিলের সামনে রাখবে। এরপর তোমার হাতে পরীক্ষা শুরু হতে ক’দিন বাকি, কোন পরীক্ষার আগে ক’দিন বিরতি তা দেখে নিজের মতো করে পাঠ পরিকল্পনা সাজিয়ে নাও। যাতে প্রতিটি বিষয়ের পূর্বে রিভিশন দেয়ার পর্যাপ্ত সময় পাও। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের কয়েকদিন যে কলমগুলো দিয়ে পরীক্ষা দেবে, সেগুলো দিয়ে লিখে অনুশীলন করবে, এতে পরীক্ষার হলে লেখা দ্রুত হবে। পরীক্ষার প্রবেশপত্র পাওয়ার পর অবশ্যই তা ফটোকপি করে রাখবে এবং পরীক্ষার আগের রাতে ট্র্যান্সপারেন্ট ব্যাগে প্রবেশ পত্রের মূলকপি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখবে, যাতে পরীক্ষার দিন সকালে তাড়াহুড়ো না হয়।
পরীক্ষার আগের রাতে তোমাদের তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার পরামর্শ দিব। যাতে ঠাণ্ডা মাথায় শান্ত মনে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পার, ধীর-স্থিরভাবে পরীক্ষা দিতে পার। দুইবছর ধরে যা পড়েছ, তাই পরীক্ষার হলে লিখবে সমস্যা হবে না। প্রস্তুতি ভালো থাকলে শুধু পরীক্ষার আগের রাতে পড়েই পরীক্ষা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না বলে আমি আশা রাখি। পরীক্ষার আগের রাতে বই ও নোটের উপর চোখ বুলিয়ে পড়াগুলো রিভিশন দিবে; যাতে কী কী পড়েছ, সেগুলো নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। পরীক্ষা চলাকালীন দিনগুলিতে খাবার-দাবারের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। অনেকে আছে যে, বিরিয়ানি, কাবাব, পিত্জা বা এধরনের ভারি খাবার পছন্দ করে, যা মোটেই পরীক্ষার সময় স্বাস্থ্যকর নয়। অভিভাবকবৃন্দ লক্ষ রাখবেন, আপনার সন্তান যেন সুস্থভাবে পরীক্ষার হলে যেতে পারে। যারা ঢাকা বা বিভাগীয় শহরের, তাদেরকে একটি বিষয় খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়, ট্রাফিক জ্যাম। হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বাসা থেকে বের হতে হবে, যেন ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পার। আর যদি দেরি হয়েই যায় তাহলে দুশ্চিন্তা না করে ঠাণ্ডা মাথায় পরীক্ষা দেওয়া শুরু করবে।
যে ধরনের প্রশ্নই আসুক না কেন আমি উত্তর দিতে পারব, এই আত্মবিশ্বাস রাখবে। পরীক্ষাভীতি না থাকলে অবশ্যই ভালো নম্বর পাবে। পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনার দিকে খেয়াল রাখবে। কতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সেই হিসেবে সময় বণ্টন করে লিখবে। লেখার গতি আর সময় বিবেচনায় রাখবে। বিজ্ঞান ও গণিতের বেলায় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে যাতে শুদ্ধ ফলাফল বের হয়। একটা প্রশ্ন বেশি সময় নিয়ে খুব ভালোভাবে লিখলে, আর বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর ভালোভাবে দিতে পারলে না; এটা ভালো নম্বর নিশ্চিত করে না। প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী সকল প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে লিখে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, তোমার হাতে সময় সীমাবদ্ধ। অল্প সময়ের মধ্যে প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে লিখতে হবে পরীক্ষার খাতায়। প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে লিখতে পারলে পরীক্ষক মূল্যায়ন করবেন যে, পরীক্ষার্থী প্রশ্নটি বুঝেছে কিনা, যাচাই করেছে কিনা। তুমি যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে অল্প লেখায় দিতে পার, তবেই সর্বোচ্চ নম্বর পাবে। আবার কোনো প্রশ্নের উত্তর অনেক পৃষ্ঠায় লিখলে, কিন্তু গুছিয়ে লিখতে পারলে না; অপ্রাসঙ্গিক কথা লিখে খাতা ভরলে কোনো লাভ নেই, নম্বর বেশি উঠবে না। কোনো প্রশ্ন কমন না পড়লে হতাশ বা উত্কণ্ঠিত হবে না। বরং প্রশ্নটি পড়ে যতটুকু বুঝবে, তোমার ধারণা থেকে ততটুকু উত্তর লিখবে। সহজ বাক্যে নির্ভুল বানানে পরিচ্ছন্নভাবে পরীক্ষার খাতায় উপস্থাপন করতে চেষ্টা করবে। নিশ্চয়ই পরীক্ষক তোমার প্রচেষ্টার মূল্যায়ন করবেন।
