ভেবেচিন্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা দরকার

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২১, ২১:১০

করোনা সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ইউনিসেফের মতে, করোনা মহামারিতে বিশ্বে প্রায় ১৭ কোটি শিশু ক্ষতির শিকার হয়েছে, ২১.৫ কোটি স্কুলের ক্লাস করতে পারেনি এবং ৩০  লাখ স্কুল থেকে ঝরে পড়তে পারে। সরকারি হিসাব মতে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করোনা সংক্রমণ কিছুটা কমে আসার পর মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আগামী ৩০ মার্চ দেশের সব স্কুল-কলেজ ও ২৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন।  সঙ্গে সঙ্গে ঝরে পড়ার আশঙ্কায় থাকা শিক্ষার্থীদের পুনরায় লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনা ও ক্ষতিগ্রস্ত  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকার আর্থিক অনুদানের প্যাকেজ ঘোষণা করে। তাছাড়া  অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের জন্য স্মার্টফোন কিনতে দেশের ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৮  হাজার টাকা করে বিনা সুদে ঋণ দেওয়া হয়। এতে সবার প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় পর শিক্ষার্থীদের পদচারণায়  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরে পাবে। কিন্তু মার্চ মাসে এসে করোনা সংক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং আগামী জুন পর্যন্ত সংক্রমণ ও বিস্তার  দুটোই বেড়ে চলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আভাস দিয়েছেন। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে শনাক্ত ৭০ শতাংশের বেশি সংক্রমণশীল করোনার মিউট্যান্ট বি.১.১.৭ ধরনটির  কারণে বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেক বেড়েই চলছে বলে অনেকের ধারণা এবং এ মিউট্যান্টটি কম বয়সি ছেলেমেয়েসহ সব বয়সিদের সমানভাবে সংক্রমিত করতে পারে। কাজেই, টিকার মাধ্যমে দেশের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের হার্ড ইমিউনিটি সৃষ্টি না করা পর্যন্ত বি.১.১.৭ ধরনটির সংক্রমণ বেড়েই চলবে বলে ধারণা। করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির এ সময়ে  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া কি উচিত হবে? 

এতদিন কম বয়সি শিক্ষার্থীদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা কম হলেও, এখন তারাই বেশি করোনা আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হচ্ছে। তাই, তারা করোনা আক্রান্ত হয়ে বা করোনার বাহক  হিসাবে খুব দ্রুতই যে সংক্রমণ ছড়াবে তাতে সন্দেহ নেই। পশ্চিমা বিশ্বের কোনো কোনো দেশে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কিছু স্কুল খুলে দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে করোনা উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় সেগুলো পুনরায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে, কানাডা  ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের যেসব সিটিতে করোনা সংক্রমণ কমে এসেছে, সেখানে কিছু স্কুল গত সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও সেসব স্কুলের কোনো শিক্ষার্থীর দেহে করোনা শনাক্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে ঐ স্কুলটি দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিয়ে ঐ ক্লাসের সব শিক্ষার্থীর পরিবারসহ শিক্ষক পরিবারকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কাজেই,  আমাদের দেশে এভাবে একটি ক্লাসের বা স্কুলের সব শিক্ষার্থী পরিবারকে কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আনলে অনেক অভাবী পরিবারের জীবন-জীবিকার ওপর আঘাত আসবে। তাই, ঐসব উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের তুলনা করা উচিত হবে না; বরং এক্ষেত্রে কোভিড-১৯ বিস্তার রোধে  কী কী কার্যকর বিকল্প পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা সরকারকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগেই ঠিক করে  রাখতে হবে।

সব শিক্ষার্থীসহ আমরা অভিভাবকরা করোনার এ ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের সময়ে লেখাপড়ার সাময়িক ক্ষতিকে প্রাধান্য না দিয়ে, বরং নিজের জীবন বাঁচানো ও আমাদের প্রতিবেশীসহ দেশের সবাইকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেওয়ার কথা চিন্তা করে করোনার মহামারি মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে। কাজেই, সরকার এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো না খুলে আরো কিছুটা সময় নিয়েই এবং করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে খোলা সমীচীন হবে বলে প্রত্যাশা করি। 

কোভিড-১৯ বিস্তারের এ ঊর্ধ্বমুখী সময়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরে আসা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া, করোনা মহামারির মধ্যে স্কুলগুলোকে সবার স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাসম্পর্কিত চাহিদাগুলোকে ভারসাম্যপূর্ণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুলগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে একটি গাইডলাইন দিয়ে রেখেছে। করোনার বিস্তার রোধের জন্য সামাজিক দূরত্ব অর্থাত্ একজন থেকে আরেক জনের মধ্যে কমপক্ষে চার হাত দূরত্ব বজায় রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এটি স্কুলে বা ছোট বাচ্চাদের জন্য মেনে চলার  বাধ্যবাধকতা হতে পারে না। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (এএপি) মতে, কঠোর  শারীরিক দূরত্ব অনুসরণ করা একটি আদর্শ একাডেমিক, সামাজিক ও মানসিক শিক্ষার মানগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ঘটাতে পারে। কাজেই, করোনার বিস্তার কিছুটা রোধের জন্য স্কুলে পুরোটা সময় মাস্ক  পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই এবং আমাদের দেশে বিশেষ করে জুনিয়র হাইস্কুল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এটা বাস্তবায়ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আমাদের দেশের কয়েকটি বড় শহর ছাড়া আর কোথাও স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা তো  দূরের কথা, কাউকে মাস্ক পরতে দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই করোনার অস্তিত্বকেই বিশ্বাস করছেন না এবং করোনা তাদের জন্য নয়, এমন বিশ্বাসে অটল রয়েছেন। এমতাবস্থায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি পালনে সরকারি গাইডলাইনের বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের অভিভাবককে অন্তর্ভুক্ত না করে শুধু  শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের দ্বারা কতটুকু সম্ভব হবে তা ভেবে দেখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুমে প্রবেশ  ও বের হওয়া বা চলাচলের জন্য একমুখী পথ সৃষ্টি করে ক্রস-কন্টামিনেশন প্রতিরোধ করাও  জরুরি। আমরা অভিভাবকরা ও আমাদের শিক্ষার্থী ছেলেমেয়েরা করোনার সংক্রমণের এ ঊর্ধ্বমুখী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে করোনার মহামারি  কিছুটা নিয়ন্ত্রণে না আসা  পর্যন্ত আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করি এবং দেশের মানুষকে সুরক্ষা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ নিশ্চিত করি।

n লেখক : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়