নোয়াগাঁওয়ে হামলা, ভাঙচুর

স্বাধীন সব সময়ই সরকারি দলের!

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২১, ২২:১৯

সুনামগঞ্জের শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি বহুল আলোচিত যুবলীগ নেতা শহিদুল ইসলাম স্বাধীন মেম্বারকে (৫১) গতকাল রবিবার বিকালে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে শাল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্যামকান্ত সিনহার আদালতে স্বাধীন মেম্বারকে তোলা হলে তার ১০ দিনের ও বাকি ৩২ আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বাশার। আজ সোমবার এ ব্যাপারে শুনানি হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে বুধবার নোয়াগাঁও গ্রামে       হামলা ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। মূল হোতা স্বাধীনের বিষয়ে পুলিশ ব্যাপক খোঁজখবর নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান। গতকাল তিনি  বলেন, ‘স্বাধীন কোন দলের নেতা তা দেখার বিষয় নয়। সে অপরাধী, সেই আলোকেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, গত ১৫ মার্চ দিরাইয়ে হেফাজতের সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হক বক্তব্য রাখেন। পরে ১৬ মার্চ নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক হিন্দু যুবক মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে তা সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল হয়ে যায়। পরে বিক্ষোভের মুখে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। কিন্তু পরদিন ১৭ মার্চ নোয়াগাঁও হিন্দু পাড়ায় হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলার পেছনে স্বাধীন মেম্বারের উসকানি কাজ করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে  স্বাধীনকে আটক করে পিবিআই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, যখন যে সরকার-সেই সরকারি দলেই থাকেন স্বাধীন। স্বাধীন সব সময় ক্ষমতাসীন দলের কাছের মানুষ। সে জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুললেও এখন কেউ তার সঙ্গে নেই। স্বাধীনের মূল পরিচয় সম্পর্কে দিরাই সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এহসান চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ইউনিয়নের নাচনী চন্ডিপুর গ্রামের কেরামত আলীর পুত্র সে। তার পূর্বপুরুষরা গ্রামের আদি বাসিন্দা ও মত্স্যজীবী। গ্রামের লোকজন বলেন, স্বাধীনের স্বজনরা সবসময়ই জাতীয় পার্টি ও বিএনপির পক্ষে প্রতিটি নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে। যেহেতু স্বাধীন সব সময় সরকার পক্ষে। তাই সে এখন ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। দলীয় পদ বাগিয়ে সে এখন সম্পদশালী।

জানা গেছে, ৯৬ সালে সাবেক এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে সর্বপ্রথম জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এবং পরে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির কর্মী হিসেবে স্বাধীনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার। তবে গত সংসদ নির্বাচনে সে আওয়ামী লীগের ড. জয়া সেনগুপ্তা এমপির পক্ষে প্রচারাভিযান চালিয়েছে। এলাকায় আলেম ওলামাদের নিয়ে ওয়াজ মাহফিলেও সে ভূমিকা রাখত। মূলত এ কারণেই সে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের ‘অন্ধ অনুসারী’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

এলাকাবাসী জানান, নাচনী গ্রাম মত্স্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি ও ইজারাদার হিসেবে একটি জলমহালের ভোগদখলকে কেন্দ্র করে নোয়াগাঁও গ্রামবাসীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে স্বাধীন। নোয়াগাঁও গ্রামবাসী জানান, তাদের গ্রামের পাশের একটি জলমহালের ইজারাদার স্বাধীন মিয়া। জানুয়ারি মাসে জলমহাল নীতিমালা উপেক্ষা করে ঐ জলমহালটি সেচে মাছ ধরে সে। এতে এলাকার কৃষকদের জমিতে সেচের সমস্যা দেখা দিলে মামুনুলের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়া যুবক ঝুমন দাস স্বাধীন মিয়ার বিরুদ্ধেও স্ট্যাটাস দিয়েছিল। এর আগে স্বাধীন মিয়াকে আর্থিক জরিমানাও করে প্রশাসন। ক্ষুব্ধ হয়ে স্বাধীন মিয়া গ্রামবাসীকে হুমকি দেয়। এরপর ঐ দিন হামলায় ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে কাজে লাগায় স্বাধীন।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি মতিউর রহমান গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে বলেন, মূলত আমাদের বিরোধীপক্ষ বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজত মিলে এই ঘটনাটি বড় করেছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উসকানিমূলক কথা বলে তাদেরকে হামলা করতে অনুপ্রাণিত করেছে সরকারবিরোধীরা। জলমহাল নিয়ে স্বাধীন মেম্বারের সঙ্গে বিরোধের ক্ষেত্রেকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অভিযোগপত্র :পুলিশ সুপার

দুপুরে সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রেস বিফিংয়ে  পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ঐ গ্রামে এখন শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। কারো আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করা হবে। নিরীহ কোনো মানুষ হয়রানির শিকার হবে না। যতদিন প্রয়োজন পুলিশ সেখানেই থাকবে। তিনি বলেন, নোয়াগাঁও গ্রামের সঙ্গে প্রধান আসামি শহিদুল ইসলাম স্বাধীন মিয়ার বিরোধ ছিল। তবে পুলিশ এ বিষয়ে তদন্ত করছে। মামলার অভিযোগপত্র স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। এসপি আরো বলেন, নোয়াগাঁও গ্রামের স্ট্যাটাসপ্রদানকারী যুবক ঝুমন দাস বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি শাল্লা উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। ঝুমনকে আটকের পর ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তবে ঝুমন দাসের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে শাল্লা উপজেলা ছাত্রদলের বর্তমান আহ্বায়ক তারেক হাসান বলেন, ঝুমন দাস একসময় ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দুই বছর আগে তিনি নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। ঝুমন দাস এখন বিএনপি বা ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত নন।

প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত

বরিশাল অফিস  জানায়, শাল্লায় বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর এবং লুটের প্রতিবাদে শহরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। গতকাল বেলা ১১টায় নগরীর সদর রোডে বিবির পুকুর পাড়ে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন  থেকে  এ ঘটনায় অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার-পূর্বক কঠোর বিচার দাবি করা হয়। 

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, একই সময় উপজেলা চৌমুহনী চত্বর এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, পূজা উদ্যাপন পরিষদ, মহিলা ঐক্য পরিষদ ও তরুণ সনাতনী সংঘ (টিএসএস)। মানববন্ধনে বক্তারা হামলায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।