১৯৭১ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী বাংলা একাডেমি যে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছিল সে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে। আমাদের মনে আছে বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতার একটি অংশে বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের রক্তঝরা মাস। তিনি সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেছিলেন, আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, সাবধান থাকতে হবে, প্রস্তুত থাকতে হবে—যেন আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারি। বঙ্গবন্ধুর সেই সাবধানবাণী যে কতটা সত্য ছিল তা আমরা বুঝতে পারলাম ১লা মার্চে, যেদিন জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করেছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা। তারপরই শুরু হলো অসহযোগ পৃষ্ঠা আন্দোলন বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে। বাঙালিরা দলে দলে স্কুল-কলেজ-অফিস ছেড়ে বেরিয়ে এলো রাজপথে। এই সময় আমি ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে কর্মরত ছিলাম। আমরাও অফিস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। যোগ দিয়েছিলাম জনতার মিছিলে। আমার মনে হয়, বাঙালিরা সবাই সেদিন একাত্ম হয়ে গিয়েছিল সেই অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে।
এরপরই এলো ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের দিন। ঢাকার পথে পথে মানুষের মিছিল ছিল সেদিন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান উপচে পড়েছিল গণমানুষের জোয়ারে। সেদিনের সেই ভাষণ বাংলার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং আমরা যেন বুঝতে পারছিলাম এক অবধারিত যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। মার্চের সেই দিনগুলোর কথা কখনো ভুলতে পারব না আমরা। আমাদের সবার চেতনা বঙ্গবন্ধুর আহ্বনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। আমরা যেন মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সেই উদাত্ত বাণী—এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। দেশ জুড়ে বাংলায় মানুষ স্বাধিকার আন্দোলনের পথে এগিয়ে গিয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। নানা জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। সেই প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা পর্যন্ত, ২৫শে মার্চ রাত পর্যন্ত। আমি নিজে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম চলে গিয়েছিলাম। সেখানেও সেই একই দৃশ্য। ছাত্রজনতা জেগে উঠেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বাঙালির অধিকার আদায়ের সাংগ্রামে। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করেছিল, তার খবর পৌঁছে গিয়েছিল ২৫শে মার্চ রাতেই। শেষরাতের দিকে চট্টগ্রামে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সেই হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত। তার পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা—৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির বিজয়।
[লেখক :শিশু সাহিত্যিক]
ইত্তেফাক/টিআর
