ইউপি নির্বাচন

খুলনায় বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে শঙ্কায় আওয়ামী লীগ

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২১, ২১:২৫

এনামুল হক, খুলনা অফিস

খুলনায় আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে আওয়ামী লীগ। দলীয় ‘মনোনয়ন পেলেই জয়’—এমন মনোভাবে তৃণমূলে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে ঘোষিত দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগামী ১১ এপ্রিল খুলনায় নয় উপজেলার মধ্যে প্রথম দফায় পাঁচটি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই ইউনিয়নগুলোতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী দেড় শতাধিকেরও বেশি। এদের মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যান, সাবেক চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং জেলা পরিষদের কয়েক জন সদস্যও রয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে নির্বাচনের মাঠে জোরেশোরে গণসংযোগ করছেন। সাধারণ মানুষের ধারণা বিএনপির ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন না করার ঘোষণায় আওয়ামী লীগে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। খুলনা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খোদাও একই ধারণা ব্যক্ত করে বলেন, নৌকা প্রতীক পেলেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়লাভ করবে এমন মনোভাবে কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, এর চূড়ান্ত ফল হিসেবে ক্ষমতাসীন দলটির  তৃণমূলে কোন্দল বাড়বে।

দাকোপ উপজেলা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১১ এপ্রিল প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দাকোপে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীর ছড়াছড়ি হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ৯টি ইউনিয়নে ৩৬ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত ৯ জন প্রার্থী ছাড়া অধিকাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থীই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি লাউডোব ইউপি চেয়ারম্যান সরোজিত্ কুমার রায় জানান, তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। গতবার তিনি স্বাতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন বলে জানান। তেরখাদা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে নির্বাচনি হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রার্থীরা ইতিমধ্যে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিতে শুরু করেছে। প্রতিটা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মাঠে নেমেছে। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী জানান, তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন জনসেবা নিশ্চিত করার জন্যে। তারা বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যানদের ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ায় তারা প্রার্থী হতে চান। প্রতিটি ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। আজগড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বাদশা মল্লিক জানান, গত ইউপি নির্বাচনে তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ভোট ডাকাতি করে তাকে ঠকানো হয়েছিল। মধুপুর ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী কাজী কামাল হোসেন বলেন, এবারে ইউনিয়নবাসী নতুন প্রার্থী খুঁজছে।

বটিয়াঘাটা উপজেলার গঙ্গারাপুর, সুরখালী ও আমীরপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী। গঙ্গারামপুর ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি হাদী উজ্জামান হাদী দলীয় মনোনয়ন লাভ করেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক চেয়ারম্যান শিবপদ মণ্ডল, রামপ্রসাদ রায়, মানিরুজ্জামান। এ ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন বিএনপি নেতা সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল গণি বিশ্বাস। বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক পেয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মুশিবুর রহমান। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা আসাবুর রহমান আসাব মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তাছাড়া বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম হাসানও নির্বাচন করছেন। আমীরপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভ পেয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম মিলন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক চেয়ারম্যান ফুজ্জত হোসেন ও পার্থ সারথী দত্ত। কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৪২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। প্রত্যেক ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছে।

এদিকে, খুলনায় বিতর্কিতদের নৌকা প্রতীক দেওয়ায় ক্ষোভ বিরাজ করছে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম আবদুল্লাহ আল মামুন লাভলু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়ায় বিক্ষোভ জানিয়েছে ইউনিয়ন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। গত ১৪ মার্চ বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৪ নম্বর মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনের সড়ক আটকে তারা বিক্ষোভ করেন। এর আগে গত ১৩ মার্চ রাত সোয়া ১০টার দিকে দিঘলিয়া উপজেলার যোগীপোল ইউনিয়নের বহিষ্কৃত চেয়ারম্যান আনিচুর রহমানকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেওয়ায় আওয়ামী লীগের ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা ফুলবাড়ী গেটে খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধ করে। অবরোধে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা বলেন, যোগীপোল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনিচুরের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্প একটি বাড়ি একটি খামারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের অনাস্থায় তাকে মন্ত্রণালয় চেয়ারম্যান পদ থেকে সম্প্রতি বরখাস্ত করেছে। তার পরও তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ বলেন, গতবার যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিল এবার তাদের কাউকেও দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এবারের নির্বাচনেও যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হবে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।