স্বাধীনতাযুদ্ধে চিত্রশিল্পীদের অবদান

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২১, ২২:০০

বাঙালির সহস্র বছরের প্রাণের দাবি ‘স্বাধীনতা’। দীর্ঘকালের শাসন, শোষণ, বঞ্চনার শিকার এ বাঙালি জাতি। বহু আগের ইতিহাস বাদ দিলেও অন্তত ঔপনিবেশিক শাসন আমল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যে তিমিরে ডুবেছিল তার অবসান ঘটল ‘স্বাধীনতা সূর্য’ উদয়ে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অগ্নিঝরা ভাষণের পর উত্তাল মার্চে অকুতোভয় বাঙালি জাতির ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার সোনালি সূর্য উদয় হয়। স্যালুট সেই প্রেরণার ‘মার্চ’কে।

ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু পর্যন্ত দীর্ঘ ১৯-২০ বছরের প্রস্তুতির পর স্বাধীনতার ডাক দিলেন বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু। ছাত্র, শ্রমিক, জনতা সবাই মিলে এগিয়ে আসে স্বাধীনতা নামক লালিত স্বপ্ন পূরণের জন্য। যে যেভাবে পেরেছে তার জায়গা থেকে অংশগ্রহণ করেছে মুক্তিযুদ্ধে। লেখক, গায়ক, কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবী যার যার জায়গা থেকে অংশগ্রহণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। সংগ্রাম পরিষদের গায়করা গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনাকে জাগ্রত করেছে। তেমনি এদেশের চারুশিল্পী সমাজ প্রেরণা জোগায় আন্দোলন-সংগ্রামের। এগিয়ে আসে মহান মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধা হিসেবে হাতে রং-তুলির অস্ত্র নিয়ে।

শিল্পী হিসেবে যোদ্ধার মতো যারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন তারা হলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, পটুয়া কামরুল হাসান, দেবদাস চক্রবর্তী, বীরেন সোম, আবুল বারাক আলভী, শাহাবুদ্দিন আহাম্মেদ, চন্দ্রশেখর, মুস্তাফা মনোয়ারসহ আরো অনেকে। তত্কালীন চারুশিল্পীরা তাদের তুলির সঠিক ব্যবহার করেছিলেন দেশমাতৃকাকে বাঁচাতে। শুধু মুক্তিযুদ্ধেই নয় দেশের যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের চারুশিল্পী সমাজ। শুধু দেশমাতৃকার সন্তান হিসেবেই নয় বরং শিল্পী হিসেবে বিবেকের কাছে শিল্পের দায়ে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থানের মতো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারা বারবার প্রমাণ করেছেন শিল্পীরা প্রেরণা দেয় আন্দোলন-সংগ্রামের।

সত্তরের দশকের চিত্রশিল্পীরা তাদের তুলির আঁচড়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ইয়াহিয়া খানের মসনদ। শিল্পীদের ফেস্টুন, কার্টুন, ব্যানার, পোস্টার, ব্যঙ্গচিত্রগুলো যেন বন্দুক, রাইফেল, গ্রেনেড, কামান, বোমার মতো বিস্ফোরক হয়ে হাজির হয়েছিল পাকিস্তানিদের সামনে।

জয়নুল আবেদিন যুদ্ধের সময় দেশেই ছিলেন এবং শেষ পর্যায়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সময় আত্মগোপন করে জীবন রক্ষা করেছিলেন। যুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায়ও তার তুলি থেমে যায়নি। এঁকে গেছেন একের পর এক চিত্র। তার ‘শরণার্থী’ নামের ছবিতে দেখা যায় ভীতসস্ত্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্তের উদ্দেশে চলে যাওয়ার চিত্র। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামক স্কেচে ফুটে উঠেছে রাইফেল হাতে চোখে মুখে বিজয়ের দৃঢ়প্রত্যয়ে ক্ষিপ্র পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধাদের এগিয়ে আসার চিত্র।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদানকারী শিল্পীদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র পটুয়া কামরুল হাসান। তিনি অনুভব করেছিলেন একমাত্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির সত্যিকারের মুক্তি সম্ভব। ১৯৭১-এর মার্চে স্বৈরাচারী শাসক ইয়াহিয়া খান যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হিটলারি কায়দায় গণহত্যা শুরু করল, তখন তিনি উত্তপ্ত বেদনা আর ক্ষোভে জ্বলে ওঠে ‘ইয়াহিয়ার এই জানোয়ারটা আবার আক্রমণ করতে পারে’ শিরোনামে সদৃশ প্রতিকৃতি দিয়ে ১০টি পোস্টার আঁকেন। পোস্টারগুলো শহিদ মিনারে জনসাধারণের জন্য প্রদর্শন করা হয়।

বরেণ্য চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের অগণিত শহিদ নর-নারীর নির্মম নারকীয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘গণহত্যা’ শিরোনামে একটি বড় তৈলচিত্র নির্মাণ করেন। যাতে দেখা যাচ্ছে অগণিত নর-নারীর কঙ্কাল স্তূপীকৃত হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে অবস্থানরত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের কিছু দুর্লভ চিত্রকর্ম আমরা পাই, যেমন—১৯৭১ এদেশ পত্রিকায় শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘জাহান্নাম হতে বিদায়’-এর জন্য বেশকিছু স্কেচ, যা ছিল খুবই অসাধারণ।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অপেক্ষকৃত তরুণ শিল্পী রফিকুন নবী ঢাকায় অবরুদ্ধ ছিলেন। যুদ্ধের নয় মাস আতঙ্ক ও উত্কণ্ঠার মধ্য দিয়ে বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা করেছেন প্রতিটি মুহূর্তে। এ ভাবনা থেকেই আঁকেন ‘বিজয়’ নামের চিত্রটি। ১৯৭১ সালের আগস্টে এই চিত্রটির কাজ শুরু করেন আর শেষ করেন ১৬ ডিসেম্বরে। এই ছবিটিতে বিজয়ের চিহ্ন বোঝাতে প্রতীক হিসেবে হাতির ফিগার ব্যবহার করেন। চিত্রকলা যে প্রতিবাদের অনেক বড় হাতিয়ার হতে পারে এবং অবদান রাখতে পারে ‘বিজয়’ তারই প্রমাণ।

১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিড়লা একাডেমিতে একটি প্রদর্শনীতে ১৭ জন শিল্পীর ৬৬টি শিল্পকর্ম স্থান পায়। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত ভাস্কর শ্রী দেবীপ্রসাদ রায় চৌধুরী। স্বপ্নের স্বাধীনতা বাস্তবে রূপ নেয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।

অগ্নিঝরা এ মার্চের প্রেরণা ও বার্তা আবহমান কাল ধরে বাঙালির হূদয়কে উজ্জীবিত করে রাখুক। সামনে এগিয়ে চলার শক্তি জোগাক, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার হাতিয়ার হোক, হোক বিশ্বজয়ের বিজয়ধ্বজ।

n লেখক :চিত্রশিল্পী