স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বছরে প্রথমেই স্মরণ করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেইসঙ্গে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এম মনসুর আলী, আবুল হাসানাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের—তাঁদের সবার উদ্দেশে আমার লাখো কোটি সালাম, নমস্কার, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।
এবার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের মাস বলেই নয়—এই মার্চ মাস আমাদের বাঙালিদের জীবনে গভীর অর্থবহ। মার্চের ৭ তারিখে সেই ১৯৭১ সালে আমাদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছিলাম দিকনির্দেশনা—আমরা কীভাবে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হবো। তারপর ১৭ই মার্চ, ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্ম, তাঁর জন্মশতবর্ষ আমরা উদযাপন করছি। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি মুজিবজন্মশতবর্ষে শামিল হতে পেরে। আর ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করলে ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত না করা পর্যন্ত বাঙালিদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। সেই স্বাধীনতা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হতে যাচ্ছে।
১৯৭১ সালে আমি ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তিনি যখন উচ্চারণ করলেন সেই অমোঘ বাণী—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’; তখন সেই উত্তাল গণসমুদ্রে মনে হচ্ছিল সবাই এক একজন বিপ্লবী।
আমি ১৯৬৬ সালে নীলফামারী থেকে এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। মনে পড়ে একদিন ক্লাস করছি। এমন সময় সাদা পাঞ্জাবি পরা উঁচু লম্বা একজন মানুষ ক্লাসরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মে আই কাম ইন স্যার’ আমাদের শিক্ষক পড়ানো থামিয়ে সেদিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘আমি খুব অল্প সময় নেব। ছাত্রভাইদের সঙ্গে একটু কথা বলব।’ আমাদের স্যার বললেন, ‘ক্লাসে তো সেই সুযোগ নেই।’ কিন্তু ঐ ভদ্রলোক ক্লাসে ঢুকে আমাদের উদ্দেশ করে বলতে থাকলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের কী করে শোষণ করে যাচ্ছে। কীভাবে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে...। তাঁর কথা শেষ হতে আমরা তাঁকে অনুসরণ করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে বটতলায় গেলাম। অন্য ক্লাসের ছেলেরাও বেরিয়ে এলো। আমি আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, যিনি আমাদের ক্লাসে এসে কথা বললেন তাঁর নাম। বন্ধুটি জানাল—তিনি আবদুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সেই প্রথম রাজ্জাক ভাইকে দেখি।
আমি তারও আগে থেকে বেতার-টেলিভিশনে গান গাইতাম। লোকসংগীত বিশেষ করে ভাওয়াইয়া। আন্দোলন-সংগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য শিল্পীদের ডাক পড়ত। ভাসানী (ন্যাপ), ছাত্র ইউনিয়ন সবার ডাকেই যেতাম গান গাইতে। সেখানে তো ভাওয়াইয়া গাইলে হবে না। গণসংগীত, দেশাত্মবোধক গানের চাহিদা তখন। শেখ লুত্ফর রহমান, আবদুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ, সুখেন্দু চক্রবর্তী আমাকে ‘ভাতিজা’ বলে ডাকতেন; এঁদের সঙ্গে আমার বাবা ভাওয়াইয়া গানের লেখক, সুরকার ও শিল্পী হরলাল রায়ের খুব ভালো সম্পর্ক। যা হোক, তাঁদের কাছে আমার গণসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান শেখা।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতারে আমার গাওয়া চারটা গান বাজতে শুরু করে। আমি তখনো স্বাধীন বাংলা বেতারে যাইনি। হিজ মাস্টারস ভয়েজের ইস্ট পাকিস্তানি চিফ কলিম শরাফীর তত্ত্বাবধানে হাফিজুর রহমানের লেখা ঐ চারটি গান রেকর্ড হয়। আমার একার একটি একক গান ছিল—‘ও বিড়াল মাথা খাইয়ো না’। স্বাধীন বাংলা বেতারে যাওয়া শিল্পীদের মধ্যে আমি ছিলাম পঞ্চম। আমার আগে যাওয়া চার শিল্পী হলেন—মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, মোকসেদ আলী সাঁই এবং মান্না হক। সেই সময় স্বাধীন বাংলা বেতারের গান ও অন্যান্য অনুষ্ঠান যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে; তেমনি বাংলাদেশের মানুষকে যারা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন না, কিন্তু বিভিন্নভাবে যুদ্ধের অংশীদার হয়েছেন—তাঁদের দিয়েছে শক্তি-সাহস। পৃথিবীর আর কোনো যুদ্ধে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিল্পী-কুশলীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কথা আমার জানা নেই। আমি বলব—আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ১১ সেক্টরের বাইরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রও ছিল আরেকটি সেক্টর। এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের মূল্যায়ন সেভাবে হয়নি—এদিকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।
মুক্তিযুদ্ধে আমরা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নিয়েছি—কেউ কাউকে বড় বা ছোট করে দেখিনি। বঙ্গবন্ধু এমন এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন—যেখানে সমস্ত ধর্মের লোক মিলেমিশে থাকবে, যার যার ধর্ম সে সে নির্বিঘ্নে পালন করবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে—স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন আমাদের দেখতে হচ্ছে। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক শান্তি-সৌহার্দ্যের বাংলাদেশ কবে পাবো?
লেখক: কণ্ঠশিল্পী ও শব্দসৈনিক
ইত্তেফাক/এমআর
