সুদীপ্ত রিজওয়ান
আজ কেয়ামনির মনটা বেশ ভালো। বেশ বড়সড় একটা চায়ের বাক্স পাওয়া গিয়েছে, কেয়ামনির আব্বা গত সপ্তাহে এক বাক্স ইস্পাহানি চা এনেছিলেন, চায়ের সেই বড় বাক্সটাই দখলে নিতে পেরেছে সে। বয়স সবে আটে পড়েছে কেয়ামনির, সারাটা দিন পুতুলের ঘর-সংসার সাজাতেই সময় কেটে যায়। গতকালই আম্মার সেলাইয়ের কাজ থেকে বেঁচে যাওয়া টুকরো কিছু কাপড় দিয়ে নতুন তিনটি পুতুল বানিয়ে ফেলেছে কেয়ামনি, আজ আবার মস্ত বড় চায়ের বাক্সটিকে পুতুলের ঘর বানানোর উত্তেজনায় চোখে পানি চলে আসছে বারবার!
পুতুলগুলোকে বাক্সে সাজিয়ে সবেমাত্র খেলা শুরু করেছিল কেয়ামনি, পুতুলের নতুন ঘর নিয়ে অনেক পরিকল্পনা তার, কিন্তু খেলা বেশিদূর এগোল না।
ঠক! ঠক! ঠক!
চারদিকে শুনশান নীরবতা নেমে এলো। বাড়ির সবাই হঠাত্ করেই চুপচাপ হয়ে গেল। আবারও সদর দরজায় শব্দ—ঠক! ঠক! ঠক!
কে?
কেয়ামনির আম্মা নিচুগলায় জানতে চাইলেন।
আপা দরজা খোলেন, মিলিটারি সাব আইছেন।
একাত্তরের এপ্রিল মাস। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের মুক্তিকামী জনতা ইতিমধ্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কেয়ামনির বড়োভাই খালেদও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই যুদ্ধে যোগ দিতে বাড়ি ছাড়েন। শহরে মিলিটারি আসামাত্রই দালাল-রাজাকার মারফত সেই খবর পৌঁছে যায় মিলিটারি কমান্ডারের কাছে।
কেয়ামনির আম্মা বেশ খানিকটা সময় নিলেন। প্রচণ্ড ভয় পেলেও বিপদে ধৈর্যহারা হলেন না। সব ভাইবোনসহ কেয়ামনিকে পাঠিয়ে দিলেন বাড়ির পিছনের ঘন জঙ্গলের দিকে। ভয়, আতঙ্ক আর তাড়াহুড়োর মাঝে পুতুলের বাক্সটি আনতে ভুলে গেল কেয়ামনি। প্রচণ্ড ভয় পেলেও তার মন পড়ে রইল বাড়ির ভিতরে পুতুলের বাক্সটির কাছে।
ঘণ্টাখানেক সময় কেটে গেল এর মাঝে। মিলিটারি কমান্ডার খালেদের খোঁজ পেতে বেশ জেরা করল কেয়ামনির আব্বা-আম্মাকে। বাড়ির প্রতিটা ঘর সার্চ করে তছনছ করে ফেলল আসবাবপত্র। যাওয়ার আগে কমান্ডার শাসিয়ে গেল—এক সপ্তাহের মধ্যে খালেদের খোঁজ না দিলে আবারও আসবে তারা!
মিলিটারিরা চলে গেলে আব্বা-আম্মা সবাইকে জঙ্গল থেকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। কেয়ামনি দৌড়ে তার পুতুল খেলার ঘরে চলে এলো। একি! তার পুতুলের বাক্স কোথায়! সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পুতুলের বাক্সের খোঁজ পাওয়া গেল না। সে কি তবে বাইরে ফেলে এসেছে বাক্সটা? কেয়ামনির স্পষ্ট মনে আছে, মিলিটারি আসার আগে এই ঘরেই পুতুলের বাক্সটা রেখে গিয়েছিল সে! প্রচণ্ড অভিমানে চোখ ভেঙে কান্না এলো কেয়ামনির। তার নতুন পুতুল! নতুন পুতুলের বাক্স!
ওমা, মা! আমার পুতুলের বাক্সটা কই? বলো না মা, এখানেই তো রেখে গেলাম। ওরা কি বাক্সটা নিয়ে গেল! ওরা কি পুতুলগুলো ফেলে দেবে?
আম্মাকে বারবার প্রশ্ন করতে লাগল কেয়ামনি। আম্মা নিশ্চুপ হয়ে থাকেন অবুঝ কেয়ামনির প্রশ্নে। নিখোঁজ ছেলের চিন্তায় অবুঝ কেয়ামনির সরল প্রশ্ন তাঁর কানে পৌঁছায় না।
হুজুর বক্স ম্যায় তো চা-ই নেহি হ্যায়! ইয়ে তো পুতলা কা ঘর!
গুড়িয়া কা ঘর? ফেল দো ইস কো, রাবিশ!
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
