‘মেলায় হারিয়ে যাওয়া বালক’

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২১, ২১:৫৮

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সাভার থেকে রোজ আসতাম বইমেলাতে। তখন আমাদের জম্পেশ আড্ডা জমত বহেড়াতলার লিটল ম্যাগ চত্বরে। আর কত কত কবি-লেখকের সঙ্গে যে সরাসরি দেখা এই উদার আঙিনায়! সরদার ফজলুল করিমকে কষ্ট করে কিন্তু অমলিন হাসিমুখে দেখতাম ঘুরছেন বইমেলায়, তাকে আর দেখবনা—ভাবতেই পারি না। বইয়ের মানুষ পলান সরকারই বা মেলা থেকে কোথায় হারিয়ে গেলেন? একবার মেলায় হঠাত্ দেখি একটি গাড়ি ঢুকে পড়েছে। আমরা হইহই করে উঠলাম; গাড়ি নিয়ে ঢুকে মেলার শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছে কে? আরে, পরে দেখা গেল তিনি বাংলা গানের এক রাজপুত্র-মান্না দে তার নাম। ঢাকায় এসেছেন আর বইমেলায় আসবেন না, তাই কি হয়! হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে একদল ‘রূপা’ আর ‘হিমু’দের উচ্ছ্বাসও চোখে পরে না আর। ভাবা যায়, একজন লেখকের জন্য তার বইয়ের প্রধান প্রকাশক ‘অন্যপ্রকাশ’-এর স্টল বইমেলায় সবসময় একই জায়গায় নির্ধারিত ছিল ; এ তো লেখক ও তার লেখার জয়। হুমায়ুন আজাদ বহুবছর ছিলেন বইমেলার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণ; ‘আগামী’র স্টলে বসে তিনি অটোগ্রাফ দিয়ে চলতেন ‘নারী’, ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’ কিংবা ‘মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ’ বইগুচ্ছে। আর কি না ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ নামে একটা বই লেখার ‘অপরাধ’-এ বইমেলার সামনেই তাকে কুপিয়ে জখম করা হল! বইমেলা এলে তার কথা স্মরণে আনি আর অস্ফুট-স্বরে স্বগতোক্তি করি ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?’ হুমায়ুন আজাদের পথ ধরে যেন একইভাবে আঘাত করা হলো অভিজিত্ রায়ের ওপর। একদল তরুণ মুক্তচিন্তককে নিয়ে মেলা ঘুরতে আর দেখা যায় না তাকে ; শুধু তাকে তো নয়, তার প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপন কিংবা আহমেদুর রশীদ টুটুল ভাইকেও মিস করি বইমেলা এলে। দীপন ভাইকে তো প্রাণই দিতে হলো বইবিরোধী অপশক্তির হাতে আর টুটুল ভাই তবু দেশে না থেকেও অন্তর্জালে আছেন আমাদের সঙ্গে। কিন্তু ‘শুদ্ধস্বর’-এর স্টলে টুটুল ভাই ও সৈয়দ শামসুল হক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিক্রি করছেন সদ্য প্রকাশ-পাওয়া ‘জলেশ্বরীর দিনপত্রী’ কিংবা ‘তোমার চোখে আমার ছবি’; এই দৃশ্যটা খুব মিস করি। বইমেলার উদ্বোধনী দিনে যেমন এবার থেকে আর দেখা গেল না আনিসুজ্জামান স্যারকে। তার ছাত্রী প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকের গায়ের চাদর ঠিক করে দিচ্ছেন—এই পরিচিত দৃশ্যটি চিরতরে হারিয়ে গেল আনিস স্যারের প্রয়াণে।

বইমেলায় এবার সবচেয়ে বেশি অভাব অনুভব করছি ও করব ‘একুশ’-কে। ‘একুশে বইমেলা’-কে মধ্য মার্চে নিয়ে ছাড়ল মৃত্যুমারি কোভিড-১৯। তবে নামে তা ‘একুশে বইমেলা’-ই রইল। কিন্তু ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ আর তার আগে আগে ফাল্গুনী আভায় রাঙা প্রহরগুলো আবার কবে যে ফিরে পাব! এই দিনগুলোতে মেলায় ভিড়ের আতঙ্কে যেমন তটস্থ থাকতাম তেমনি না এসেও পারতাম না, কারণ আমার প্রথম প্রথম মেলায় ঘোরার  প্রিয় কথাশিল্পী হরিপদ দত্ত বলতেন ‘আরে মিয়া, মানুষের ভিড় ছাড়া মেলা হয় নাকি!’ আর প্রিয়জন কবি বেলাল চৌধুরী বলতেন ‘মেলা খেলা সারাবেলা’। বেলাল ভাইয়ের কবিতার মতোই তো মেলায় খুঁজি ফিরি সেই কাঙ্ক্ষিত মুখ; তারপর খুঁজে পেয়ে কবিতার ভাষায় তাকে বলি ‘দেখা হল অবেলায়, বইমেলায়’। কিংবা, আল মাহমুদের কবিতার মতো নিজেকে ভীষণ ভাবি ‘মেলায় হারিয়ে যাওয়া বালক’ বলে।