বইমেলা কখন শুরু হয়েছিল? এর ব্যাপ্তি যে এত ব্যাপক, কীভাবে সৃষ্টি হলো তা জানার আগ্রহ রয়েছে পাঠকের। ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বইমেলার আলোচনায় সূত্রপাত ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমিতে। ১৯৬৪ সালে একটি বইমেলার আয়োজন টিচার্স ট্রেনিং কলেজে, অন্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের নিচ তলায়। প্রথমটি বছরের শুরুতে ও পরেরটি ১৮ অক্টোবর থেকে ২৪ অক্টোবর। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জে একটি সফল বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। সবচেয়ে সার্থক ও আশাসঞ্চারী বইমেলা ছিল ১৯৭২ সালে ২০ থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত বইমেলা। উদ্বোধন করেছিলেন তত্কালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। মুক্তধারা স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স ও বর্ণমিছিল বই বিক্রির ব্যবস্থা করেছিল। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের তত্কালীন পরিচালক সরদার জয়েন উদ্দীনের আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দুটি বইমেলা ছিল নজরকাড়া।
১৪ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৭৪ থেকে ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সাহিত্য সম্মেলনে যুক্ত করা হয়েছিল বই প্রদর্শনীর, একুশকে কেন্দ্র করে, ১৯৭৫ সালে মুক্তধারা বাংলা একাডেমির প্রধান ফটকে ছোট পরিসরের বইমেলার অস্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের সূচনা করেছিল। তা পরে বৃহত্ পরিসরের বইমেলা আয়োজনের এক বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বইমেলায় ধীরে ধীরে প্রকাশকদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে আয়োজিত বইমেলা পাঠক-লেখকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। বাংলা একাডেমির প্রকাশনা, মুদ্রণ বিক্রয় বিভাগ ১৯৭৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা আয়োজন করে। ১৯৭৯ সালে হয় আরেকটি বইমেলা। এসব মেলা প্রকৃত অর্থে প্রাচুর্য ও সৌন্দর্যে ভরা ছিল। ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলার নামকরণ হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা।’ ক্রমে ক্রমে বইমেলার পরিসর বৃদ্ধি পায়। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত বইমেলায় স্থান সংকুলানের অভাব তৈরি হয়। মূল প্রাঙ্গণের বাইরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলাকে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। খাবার দোকান, ক্যাসেটের দোকান, রকমারি গৃহস্থালি সামগ্রী বেচাকেনা মেলায় যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল আশির দশকে, পরে এটা বিযুক্ত হয়ে প্রকৃতিকেন্দ্রিক মেলায় পরিণত হয়েছে।
বইমেলায় রয়েছে আধুনিক প্যাভিলিয়ন, বহু রং ও রেখায় শোভিত বইমেলার স্টল প্রতিদিন দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠছে। বিজ্ঞাপন ও ভাষায় রয়েছে ভিন্নতা ও চমক।
বইয়ের নামে এসেছে পরিবর্তন। প্রচ্ছদ সাইজ রয়েছে আকর্ষণ। সুসজ্জিত বইমেলায় প্রকৃতি নানা সাজে রঞ্জিত। ঝরাপাতা, বিচিত্র ফুল, পাখির ডাক ও নানা বয়সি পাঠকের কলরবে মুখরিত বইমেলা শুধু মিলনমেলা নয়, স্মৃতিভারে গ্রথিত একটি অনন্য কেন্দ্র। ভালোবাসার টানে, নতুন বইয়ের গন্ধে আমরা বইমেলায় আসি, আবার ঘরে ফিরে যাই। সঙ্গে নিয়ে যাই প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য স্মৃতি। বইয়ে পড়া কোনো চরিত্র অলক্ষ্যেই হয়ে যাই। আনন্দ-বেদনায় লীন হয়ে কখনো দুই চোখ ভিজে যায়। দীর্ঘশ্বাস বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। অতীতের পাওয়া না পাওয়া নিয়ে যে দোলাচালে আমরা বন্দি থাকি তার সামান্যটুকুই আমরা ধারণ করতে পারি। বইমেলা ঘিরে রকমারি বইয়ের সমাহার দেখা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের অনুভূতি আলাদা।
এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বইমেলা ঘিরে বইয়ের বিক্রি বেড়েছে। বই মেলায় নতুন লেখকদের অভিষেক ঘটে। ঢাকা শহরে বিনোদন কেন্দ্র সংকুচিত হয়ে গেছে। বইমেলায় আসা-যাওয়ার কিছুটা বিনোদন ঘটে। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ক্ষণে বইমেলা আয়োজন করার আনন্দ উপভোগ করবেন প্রকাশক, পাঠক ও লেখক।
মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের ভাগ্য। মার্চের ঐ সময়টা কি কালবৈশাখী আঘাত হানতে পারে? সে প্রস্তুতি আগেভাগে নেওয়া প্রয়োজন। বইমেলা আয়োজনে সতর্ক অবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।
শুভ হোক বই মেলা, একুশের মেলা, প্রাণের মেলা। এই মেলা ঘিরে প্রতিদিন জন্ম নিক নতুন অভিজ্ঞতা। বইমেলা চিরজীবী হোক।
n লেখক :প্রাবন্ধিক, গবেষক
