মার্চ মাস বাঙালি জাতির জীবনে একটি অনন্য তাত্পর্যপূর্ণ মাস। ২০২১ সালের মার্চ মাসেই পূর্ণ হবে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। সেক্ষেত্রে এই বছরের মার্চ মাস আমাদের জীবনে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশ্বের ইতিহাসে একেক যুগে একেক জন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করে স্বীয় দেশ, জাতি তথা সমাজকে অন্ধকার ও শোষণ থেকে মুক্ত করেন। বাঙালি জাতির ভাগ্যগুণেই তেমন এক মহাপুরুষের জন্ম হয় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। বিশ্বের সমকালীন রাজনীতিক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শ্রেষ্ঠ মনীষীরা তাকে নিয়ে ভেবেছেন, লিখেছেন এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে। প্রসঙ্গক্রমে ভারতের খ্যাতিমান লেখক নিরঞ্জন মজুমদারের ১৯৭১ সালে লেখা ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক নিবন্ধের একটি উক্তি উল্লেখ করতেই পারি। বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘দেশে দেশে নেতা অনেকেই জন্মায়। কেউ ইতিহাসের একটি পঙিক্ত, কেউ একটি পৃষ্ঠা, কেউ-বা একটি অধ্যায় আবার কেউ-বা একটি সমগ্র ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সমগ্র ইতিহাস।’
শত-সহস্রবার নির্যাতিত, নিপীড়িত, সুবিধাবঞ্চিত বাঙালি জাতির জীবনজয়ী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে নিজের কৈশোর, যৌবন বিসর্জন দিয়ে এই মহান পুরুষ স্বীয় নেতৃত্বগুণে হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা। তার আহ্বানেই ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সব বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধু ১০ লক্ষাধিক জনতার সম্মুখে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা, স্বাধীকার ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, সেই আগুন যেন ছড়িয়ে পড়ে বাংলার সর্বত্র। এরপর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সিঁড়ি বেয়ে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস বাঙালি জাতির জীবনে নিয়ে আসে নতুন বারতা। ২৫শে মার্চ কালরাতে বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সামরিক আক্রমণে ঢাকার রাস্তায় নেমে নির্বিচারে লোকজন হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যা করে তারা। এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রতিরোধের ইতিহাস। মার্চ মাসেই বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি করা হয়। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জিত হয়। আমরা পাই স্বাধীন-সার্বভৌম লাল-সবুজের পতাকার ভূখণ্ড—বাংলাদেশ।
লেখক :উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
