দেশের বিদ্যমান আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত নীতিমালা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবান্ধব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাই স্বীকার করলেন, বিদ্যমান নীতিমালায় এসএমই খাত বড় হতে পারবে না। আইনের স্পিরিটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু আদেশও (এসআরও) এ জন্য দায়ী। গতকাল মঙ্গলবার প্রাক বাজেট আলোচনাসভায় এসএমই ফাউন্ডেশনের পরামর্শক হিসেবে এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. লুত্ফর রহমান বিদ্যমান ভ্যাট আইনের কয়েকটি ধারা তুলে ধরে তা কেন এসএমই উদ্যোক্তাবান্ধব নয়, তা ব্যাখ্যা করেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে এ সময় বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা ভার্চুয়ালি তাদের মতামত তুলে ধরেন।
আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান এসএমই খাতকে সহযোগিতা দেওয়ার আগ্রহের কথা জানান। তবে এই সুবিধা যাতে অন্যরা না নিতে পারে, তার উপায় খোঁজার পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, হয়তো এসএমইকে সাপোর্ট করতে গেলে মনিটর করা কঠিন। এই খাতকে সহায়তা দিতে গেলে সুবিধা নিয়ে যাবে ট্রেডাররা। সেটি সুনির্দিষ্ট করা দরকার।
সভা শেষে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে লুত্ফর রহমান বিদ্যমান আইনের বেশকিছু অসংগতি তুলে ধরে তা এসএমই তথা ব্যবসাবান্ধব করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ভ্যাট আইনে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভার (বিক্রি) ভ্যাট মওকুফ এবং পরবর্তী ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার ট্যাক্স আরোপ রয়েছে। কিন্তু ভ্যাট বিভাগ একটি আদেশের মাধ্যমে ৮০টি সেবা ও ১২০ ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অব্যাহতির সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। আসলে এসব পণ্য ও সেবার বাইরে আর তেমন কিছু নেইও। এর অর্থ হলো, আইনে সুবিধা দিয়ে তা এসআরওর মাধ্যমে কর্তন করা হয়েছে। অন্যদিকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিলে রেয়াত নেওয়ার সুযোগ আইনে রয়েছে। কিন্তু একটি আদেশের মাধ্যমে ২৭টি সেবাকে এই সুযোগের বাইরে রাখা হয়েছে। এ ধরনের আরো বেশকিছু ইস্যু রয়েছে, যা এসএমই খাতের অগ্রগতিতে বাধা। সভায় এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে শুল্ক বিষয়ে ৩১টি, আয়কর বিষয়ে ২১টি ও ভ্যাট বিষয়ে ১১টি প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ইলেকট্রিক মটর পাম্প অ্যাসোসিয়েশন ও এগ্রিকালচারাল মেশিনারিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে রিটার্ন জমা না দেওয়া ও ভ্যাট নিবন্ধন প্রতিষ্ঠানের সামনে ঝুলিয়ে না রাখলে জরিমানা নিয়ে আপত্তি তোলেন। এ সময় তিনি বলেন, অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিরুত্সাহিত করছেন। বরং তারা আগের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হার্ড কপি রিটার্ন জমা দিতে বলেন। এছাড়া ব্যবসায়ীদের অবহিত না করেই অনেক সময় ব্যবসা আটকে দেওয়া (বিআইএন লক) হয়।
এর জবাবে এনবিআর সদস্য মাসুদ সাদিক বলেন, এনবিআর অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়াকে উত্সাহিত করছে। ইতিমধ্যে মোট রিটার্নের ৭০ শতাংশ অনলাইনে জমা হচ্ছে। এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
সভায় চা শিল্পের উদ্যোক্তাদের দাবির বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আগামী বাজেটে এই খাতকে বাড়তি কোনো সুবিধা না দেওয়া হবে না বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এই খাতকে যে পরিমাণ ভ্যাট-ট্যাক্সের সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সে তুলনায় ফেরত এসেছে কম। এই সুবিধা পাওয়ায় তাদের মধ্যে গা ছাড়া ভাব। করের বোঝা চাপলে বরং তাদের দক্ষতা বাড়বে। অন্যথায় ভোক্তারা কম টাকা চা আমদানি করতে পারলে মানুষ সে সুযোগ পাক।
এর আগে গতকাল প্রথম দফায় অটোমোবাইল ও পরিবহন খাতের উদ্যোক্তারা তাদের প্রস্তাব তুলে ধরেন।
