সড়কে বিশৃঙ্খলা ও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে কবে?

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২১, ২১:২৮

সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার কারণে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। প্রতিদিনই একের পর এক প্রাণ ঝরছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে নিরাপত্তার বিষয়টি।

এক হিসেবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মৃত্যুবরণ করেন, তাদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এই পরিবারগুলো রীতিমতো পথে বসে যায়। আহতদেরও অনেকে পঙ্গুত্বের দুঃসহ গুরুভার বহন করে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ফলে তাদের পরিবারও বিপন্ন হয়ে পড়ে। স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে দশকের পর দশক একদিকে যেমন ভারী হয়ে আছে বাংলার আকাশ-বাতাস, অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকটিও উপেক্ষা করার মতো নয়। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতির সাম্প্রতিক এক গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদহানী হয়। এই হার মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৯৫ শতাংশের সমান। সবচেয়ে বড় কথা, জীবনের চেয়ে দামি কিছু হতে পারে না। আর সেই জীবনই অকালে থেমে যাচ্ছে সড়ক-মহাসড়কের বিশৃঙ্খলায়।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, এই অপ্রতিরোধ্য ও প্রতিকারহীন সড়ক দুর্ঘটনা, এই অসহায় মৃত্যু ও আহতদের জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকার দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী কে বা কারা? সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের গাড়ি চালকদের বেশির ভাগ অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত, অনেকের লাইসেন্স নেই, অনেকের লাইসেন্স ভুয়া। এদের হাতে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক। অথচ মালিকদের একাংশ সেটাই করছে। লাইসেন্স দেওয়ার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেখান টাকার বিনিময়ে পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া লাইসেন্স দেওয়া হয়। গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রেও এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়াই চলছে অগুনতি গাড়ি।

প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকাল মৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না; এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এভাবে এত মানুষের জীবনপ্রদীপ অকালে নিভে যেতে পারে না।

শুধু চালকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে শত ভাগ কঠোর থাকতে পারলেই দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মহাসড়কে বিশেষ ক্যামেরা বসাতে হবে। কম খরচেই এটা করে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। পাশাপাশি পথচারী ও যাত্রীদের অধিক সতর্ক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টায় পথচারীদের ফুটপাত, আন্ডারপাস ও সেতু ব্যবহারে উত্সাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ঠ কারণগুলো আমলে নিয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিভিন্ন সময়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অনেক সুপারিশ করা হয়। কিন্তু যাদের ওপর এই দায়িত্ব থাকে তারাই কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয় না। অন্য একটি সমস্যা হচ্ছে পরিবহন সেক্টরে রাজনৈতিক দলের নেতাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই নেতাদের কারণে পরিবহন শ্রমিকরাও সড়কে বেপরোয়া হয়। এই বিষয়গুলো সরকারের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বংশানুক্রমিক দারিদ্র্যের শিকড় ছিন্ন করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। সেই সঙ্গে দ্রুত এগিয়ে চলছে মধ্যম আয়ের দেশে স্থান করার লক্ষ্যে। কিন্তু পেছনে এই বিশৃঙ্খলা, এই রক্ত, এই আর্তনাদ রেখে সম্মুখযাত্রা কতটা সফল ও সমীচীন হবে তা ভেবে দেখার এখনই সময়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়