মার্চ আমাদের ইতি-হাসের এক অনন্য সাধারণ মাস। মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। লাখ লাখ মানুষের কণ্ঠে ছিল মুক্তির জয়গান। শৃঙ্খল ছেঁড়ার দৃপ্ত শপথ, অপেক্ষা ছিল কখন আসবেন নেতা। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার আগমনের অপেক্ষার আর উত্তেজনার রেশ তখন মানুষের মনে। সেটি ছিল এক অন্য রকম ৭ই মার্চ।
লাখো জনতার সামনে সেদিন রেসকোর্স ময়দানে নির্মিত উঁচু মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক মহান বাঙালি। বাঙালির প্রিয় নেতা, মুক্তির দিশারি ও বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বপ্নকে স্পর্শ করার সে এক উদ্বেল মার্চ। নেতা এলেন। ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে সে এক অনির্বচনীয় শব্দমালা উচ্চারণ করলেন। মার্চের সেই উপচে পড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষের রক্ত নেচে উঠল। নেতার প্রতিটি উচ্চারণ মানুষের মনের কথা হয়ে উচ্চারিত হলো। এমন সুস্পষ্ট, এমন সুসংবদ্ধ, এমন নির্দেশনাপূর্ণ, এমন আদেশপূর্ণ এবং এমন পরিপক্ব শব্দপূর্ণ ভাষণ এ জাতি আর কখনো শোনেনি। সে ভাষণই বদলে দেয় সবকিছু। বলে দেয় কোনো গন্তব্যে যাবে বাঙালি। এখন থেকে ৫০ বছর আগে এই মার্চ মাসেই আমাদের স্বাধীনতার চারাটি রুয়ে দেওয়া হয়েছিল।
’৭১-এর ৭ই মার্চ অঙ্গুলি তুলে জাতির সামনে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন স্বাধীনতার এক অমোঘ বার্তা। মুক্তির নেশায় উদ্বেল মানুষ ব্রজকণ্ঠে নেতার কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাল। নেতার প্রতিটি উচ্চারণ হূদয় দিয়ে অনুভব করল। সে ভাষণ সমগ্র বাঙালির চেতনায় ঝড় তোলে। নেতার কাছ থেকে পেয়ে যায় অমোঘ নির্দেশনা। পেয়ে যায় পাকিস্তানি জান্তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করার মন্ত্রণা। চলে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আয়োজন। মুক্তির প্রবল নেশায় তুচ্ছ বলে মনে হয় প্রাণ। যুদ্ধের যাওয়ার প্রবল বাসনা জেগে ওঠে লাখো বাঙালির প্রাণে। দৃপ্ত শপথে জেগে ওঠে সারা জাতি। কেবল নির্দেশের অপেক্ষায়। অসহযোগ শুরু হলো পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে ৮ই মার্চ থেকেই। ভেতরে ভেতরে চলল গুছিয়ে নেওয়ার কাজ। সংগঠিত করে তোলার কাজটিও চলল গোপনে গোপনে। বাঙালি সৈন্যদল, পুলিশ বাহিনী এবং ইপিআর বাহিনী তাদের করণীয় ঠিক করে নিল। যে কোনো সময় ডাক এলে স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়ার গোপন আয়োজন চলল প্রতিটি ক্ষেত্রে। সে এক অভাবনীয় মুহূর্ত। বুঝতে বাকি থাকল না সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। লেখক :উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
ইত্তেফাক/ইউবি
