১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (২৫ মার্চ)

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২১, ২১:৩৩

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র।  বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল, ‘বাংলার উপর কোন কিছু চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা বরদাশত করা হইবে না’। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। ২৪ মার্চ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনের সামনে আসা অগণিত মানুষের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা সহ্য করা হবে না। আমাদের দাবি ন্যায্য ও সুস্পষ্ট এবং তা অবশ্যই মেনে নিতে হবে।’

১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ সকাল থেকে অসংখ্য মিছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আসতে শুরু করে। সন্ধ্যার পর পর্যন্ত মিছিল আসা অব্যাহত থাকে। নারী, পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে সমাজের সবশ্রেণির মানুষ এসব মিছিলে শরিক হন। তারা দৃপ্তকণ্ঠে সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সঙ্কল্প ঘোষণা করেন। শেখ মুজিবের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তারা স্লোগান দেন, ‘সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে চলবে।’

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে সমবেত জনসাধারণের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। কিন্তু তারা (পাকিস্তানি সামরিক শাসক) যদি তা না চান এবং জনগণকে দাবিয়ে রাখতে চান তাহলে তা পারবেন না। আশা করি, এই ভুল করবেন না। যে পর্যন্ত না বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তি পাবে, দাবি আদায় হবে, সেই পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। আপনারা শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যান। যদি আমি কোনো নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে গোলাম হওয়া থেকে রক্ষার জন্য আরও দৃঃ সঙ্কল্প নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।’ 

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে এবং যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান শেখ মুজিব। তাঁর কথায়, ‘বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ এবং কোনো শক্তিই জনতাকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। কিছুসংখ্যক লোক আমাদের সংগ্রামকে নস্যাৎ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক গোলমাল বাঁধানোর চেষ্টা করছে। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ, তখন কোনো ষড়যন্ত্র আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা যখন একত্র হয়েছি, ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য।’

সামরিক শাসকদের উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আপনারা যতই ষড়যন্ত্র করুন না কেনো, আপনারা জনগণের দাবি ঠেকাতে পারবেন না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেবো। শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করবো না। বাংলাদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো। আমার মাথা কেনার শক্তি কারও নাই। বাংলার মানুষের রক্তের সঙ্গে আমি বেঈমানি করতে পারবো না। আমি বুলেটের সম্মুখীন হতে রাজি আছি, কিন্তু জনগণকে গোলাম থাকতে দেবো না।’

কায়েমী স্বার্থবাদী মহল কর্তৃক বাংলাদেশকে শোষণের কথা উল্লেখ করে স্বাধিকার আন্দোলনের এই মহানায়কের মুখে শোনা গেছে, ‘আমরা আর কোনো অবিচার সহ্য করতে রাজি নই। হয় আমরা মানুষের মতো বেঁচে থাকবো, নয়তো বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে করতেই মৃত্যুবরণ করবো। জয় বাংলাই থাকবে, বাংলাকে আর ক্ষয় করতে দেবো না।’

বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে রায়েরবাজার মহিলা আওয়ামী লীগের বিরাট মিছিলে আসেন নারীরা। প্রতিটি মিছিলের উদ্দেশে ভাষণ দিতে হয়েছিল বলে ভবনের দোতলায় মাইক লাগানো হয়। দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ৩২ নম্বর সড়কে যে ধ্বনি মুখর থাকে তা হলো ‘জয় বাংলা’।

ইত্তেফাক/জেএইচ