রানু! ও রানু!
এই নামে কে ডাকে তাকে? মা ডাকতেন। এই এতকাল পর এই ডাক মা দেবেন, তা-ও তো ভাবা যায় না। কেননা, মায়ের রানুকে মরতে হয়েছিল। রানুকে মারার সময় এগিয়ে এসেছিলেন মা, দুই ভাই রফিক আর টুটুল। রানুর মৃত্যু দেখে মরতে হয় মাকে, ভাইদের। আর রানু শেষবারের মতো মায়ের চিত্কারে শুনেছিল সেই ডাক।
চৈত্র মাসের গরম রাতে ডাক শুনে সবুজ ধানের খেতে ছায়া মেলে দিয়ে উঠে আসতে হয় অগত্যা। কে ডাকে জানতে চায় বলেই দেখতে পায় তাকে। আকাশে ঝুলছে মায়ের মুখ। রানুর মা। স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে মেয়েকে কাছে ডাকেন। বলেন, জোছনার চাদর বিছিয়ে দিয়েছি মা।
খুব খুশি হয়ে ওঠে মেয়ে। বলে, খুব ভালো করেছ! আমার কবরে, তোমার কবরে, আমার ভাইদের কবরে জোছনার চাদর বিছিয়ে তুমি যে আমাকে কবিতা উপহার দিলে।
মা সেই আগের মতোই খুশিতে আরো আলো হয়ে ওঠেন। মেয়ের কবিতা শুনতে তার খুব ভালো লাগে। সেই যে দৈনিক সংবাদে ছাপা হলো ‘চাষী’। কবিতার নিচে লেখা কবির নাম দেখে মা খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলেছিলেন, রানু! ও রানু! তোর নাম ছাপা হয়েছে। মেহেরুন নেসা! আমার রানু কবি মেহেরুন নেসা!
এতকাল পরও মেয়েটা কবিতার কথা বলছে! এর চেয়ে খুশির বিষয় আর কী হতে পারে মায়ের কাছে? সেদিনের মতো খুশি হয়ে বলেন, কবিতার নাম কী?
মেয়ে বলে, স্বাধীনতা।
কবি মেহেরুন নেসা কবিতা ছড়িয়ে দিলেন মায়ের গায়ে। মা খুুশিতে জোছনার চাদর ছড়িয়ে দিতে দিতে আগলে ধরলেন গোটা দেশ। নাম যার বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে যদি কেউ সেই মায়ের মুখটা দেখতে না পান, নিজেকে খুঁজে না পান চাদরের আদরে, তবে তার অধিকার নেই এই দেশে থাকার।
এরকম রায় ঘোষণা করে দুই ভাই দুজনের দিকে তাকায়। একজনের নাম টুটুল। আরেকজন রফিক।‑
