এক বিস্ময়কর বাংলাদেশ

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২১, ২১:০৯

স্বাধীনতার ৫০ বছরে তথা এ বছর সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। করোনাকালে চারদিকে যখন নেতিবাচক খবরের ছড়াছড়ি ঠিক তখন সাফল্যের এ খবর পুরো জাতির জন্য গর্বের বিষয়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ডের সবকটিতেই প্রয়োজনীয় শর্তাবলি তথা যোগ্যতা অর্জনকারী একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জনের তিনটি সূচক—১. মাথাপিছু আয়, ২. মানবসম্পদ সূচক, ৩. অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক। এলডিসি থেকে উত্তরণের  যোগ্যতা হিসেবে মাথাপিছু আয়ের মানদণ্ড ১,২২২ মার্কিন ডলার বা তার বেশি। এক্ষেত্রে গত তিন বছরে বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১,৮২৭ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে যোগ্যতা নিরূপণের স্কোর হলো ৬৬ বা তার বেশি। সেখানে বাংলাদেশের স্কোর ৭৫.৪। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে যোগ্যতা অর্জনের স্কোর হলো ৩২ বা তার কম। এ মানদণ্ডে বাংলাদেশের স্কোর ২৭।

গত ১০ বছরে আর্থসামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রকাশিত ক্রোড়পত্রের সূত্রমতে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ১০২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৩৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ৭৫৯ মার্কিন ডলার, ১০ বছর পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২০৬৪ মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ১৫.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।  ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ছিল ২২.৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৪.৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের প্রবাসী আয় ছিল ৯.৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ১৮.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭.৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬.০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ৬৪,৩৩৭ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,৬৪,০৫৩ কোটি টাকা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ছিল ৫,৭১৯ মেগাওয়াট, অপরদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৪,০০০ মেগাওয়াট। ২০০৯ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল শতকরা ৪০ ভাগ, ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২০.৫ ভাগ। ২০০৯ সালে অতি-দারিদ্র্যের হার ছিল ২৫.১ ভাগ, ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০.৫ ভাগ। ২০০৯ সালে প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল ছিল ৬৭.৯ বছর, ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২.৬ বছর। ২০০৯ সালে শিশুমৃত্যুর হার এক বছরের নিচে (প্রতি হাজারে) ছিল ৩৯ জন, ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। ২০০৯ সালে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার (প্রতি হাজারে) ছিল ২.৫৯ জন, ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৬৫ জনে। ২০০৯ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৬৩.৩, ২০১৯ সালে সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪.৭।

এর ফলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে, রপ্তানির বহুমুখীকরণের ফলে নতুন নতুন বাজার তৈরি হবে, কর্মসংস্থান হবে, উত্পাদনশীলতা বাড়বে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ফলে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা, ওষুধশিল্পের পেটেন্ট প্রটেকশন প্রদান সুবিধা, ভর্তুকি প্রদানের সুবিধা, সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান সহায়তার মতো বিষয়গুলো আর নাও থাকতে পারে। যদিও বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে প্রস্তুতিকালীন সময়ের আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে এখন সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ ও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে যার যার সক্ষমতা। অভ্যন্তরীণ বাজারে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

ঢাকা