রিফাত মুনীর ইতি
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নিয়ত চেষ্টায় আছে নগরবাসীকে মশার হাত থেকে স্বস্তিদানের, যদিও নগরবাসীর জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে হঠাত্ই বেড়ে যাওয়া মশার প্রকোপ। এটা ঠিক, এডিস ও স্ত্রী জাতীয় কিউলেক্স মশার কারণে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুসহ প্রাণঘাতী নানান রোগে সংক্রমিত হওয়ার হার বাড়ছে, নগরবাসীর দিন ও রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষের মাঝে আতঙ্ক ভর করছে। মশক নিধনে গৃহীত একাধিক প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখেনি, মানুষ নিজেদের জীবনকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দিয়েছে একরকম।
প্রশ্ন হচ্ছে, মশা নিধনে ওষুধ ছিটিয়ে, নালা-নর্দমা পরিষ্কার করে, ঝোপ-জঙ্গল কেটেও তা থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না কেন? উত্তরটা কিন্তু সহজ। এর কারণ হচ্ছে এত বড় এক কর্মযজ্ঞে, জনসম্পৃক্ততার অভাব। আমরা যে সেবা সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে আশা করি, আদৌ তা নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে আমরা নিজেরা কতটুকু প্রস্তুত সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
কার্যত মশা নিধনে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে বাড়াতে হবে জনসচেতনতা। বাসাবাড়ির আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে আমরা নষ্ট করি আমাদের চারপাশ; পলিথিনসহ আমাদের ফেলা বর্জ্য যখন আটকে ফেলে নর্দমা-নালা, পরিত্যক্ত করে তোলে খাল, শিশুদের খেলার মাঠের একটা বড় অংশ পড়ে থাকে ভাগাড় হিসেবে, যখন বিদ্যালয়, অফিস ও অন্যান্য শিল্প ও বাণিজ্যিককেন্দ্রে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা থাকে উপেক্ষিত, তখন মশক নিধনে সাফল্যের দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, গৃহপালিত পশুর বর্জ্য সঠিক নিয়মে পরিষ্কার করা না হলে তা বাড়িয়ে দিতে পারে মশার প্রজনন। পুরনো ঢাকার অধিকাংশ নালা, খাল ও নর্দমা ভর্তি পরিত্যক্ত পশুর বর্জ্যে, অনেকক্ষেত্রেই এলাকাবাসীর অসচেতনতা বাড়িয়ে দিয়েছে দুর্ভোগের মাত্রা।
মূলত মশার প্রজননক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বাসাবাড়িতে নিয়ত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালু রাখা এখন সময়ের দাবি। এজন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে, গণমাধ্যমের সহায়তার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক মাইকিং, জরিমানার হার নির্ধারণ করে জনগণকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য নিয়ত তাড়না সৃষ্টি করা দরকার অবিলম্বে।
বাসগৃহে শিশুটি যখন শেখে, আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে, তখন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই বার্তা শক্ত অবস্থান পায় যে পরিচ্ছন্নতা মূলত একটি নিয়ত চর্চার বিষয় এবং এটি কীটপতঙ্গসহ রোগ-বালাই থেকে আমাদের নিরাপদ রাখে। আবার যেসব স্থানে মশার বংশবৃদ্ধির হার বেশি, সেসব স্থানে তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগাতে হবে, পরিত্যক্ত ডোবা, নালা বা খাল যেন মশার বংশ বৃদ্ধির কারণ না হয়, সে ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
মূলত, গণমানুষের অংশগ্রহণ এবং কিছু ক্ষেত্রে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া কেবল সিটি করপোরেশন কিংবা অন্য কোনো সংস্থার একক প্রচেষ্টায় মশক নিধন সম্ভব নয়। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মশার বংশ বিস্তার রোধসহ সম্ভব মশক নিধন, পরিবার ও সমাজের স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
ঢাকা
