মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ে সঙ্গী ছিল ভারত, সেই বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শামিল হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বর্ণাঢ্য উদ্যাপনে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর ১০ দিনের অনুষ্ঠানমালার শেষ দিন গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশের ৫০তম স্বাধীনতা দিবসে তিনি জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। বিকালে নরেন্দ্র মোদি জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’ এই থিমে বর্ণিল আয়োজনের অনুষ্ঠানস্থলে এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা তাকে স্বাগত জানান। এরপর ছায়ানট পরিবেশিত জাতীয় সংগীতের মধ্য দিনে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে ‘এক করে দেখলে চলবে না’। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের এ শুভ মুহূর্তে সব ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যৌথ অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের কাছেই গণতন্ত্রের শক্তি আছে, এগিয়ে যাওয়ার দূরদর্শিতা রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ অগ্রযাত্রা এই পুরো অঞ্চলের জন্য সমান জরুরি।’
বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়া আবদুল হামিদ বলেন, ‘ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যাতে বঙ্গবন্ধুর জীবনকর্ম এবং তার নীতি ও আদর্শ সম্পর্কে জানতে পারে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলা ভাষা ছাড়াও বিদেশি বিভিন্ন ভাষাতেও যাতে বঙ্গবন্ধুকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যথাযথভাবে তুলে ধরা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে গবেষক, ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে দেশটির সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মর্যাদাপূর্ণ নিষ্পত্তির প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে কূটনৈতিক অঙ্গনে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি কার্যকর ও সমুদ্রসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে। আমি আশা করি, অচিরেই অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যুরও সুষ্ঠু ও মর্যাদাপূর্ণ নিষ্পত্তি হবে।’ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ভারতের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বমানবতার ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’
সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে আমরা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাচ্ছি। বিগত ১২ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে। আমরা ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি।’
স্থিতিশীল দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে হলে ভারতকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী ছিলেন। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি তিনি স্বপ্ন দেখতেন অর্থনৈতিক মুক্তির। এজন্য পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা ও সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতার ওপর তিনি জোর দিতেন।’ মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত শুধু আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রই নয়, ভারতের সঙ্গে আমাদের রয়েছে ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত ও ভৌগোলিক সেতুবন্ধ।’ ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্কের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বর্তমানে আমাদের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাধীনতা সম্মাননা, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়িকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননাসহ ২২৫ জন ভারতীয় নাগরিককে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননায় ভূষিত করার কথা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মর্যাদাশীল ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০২০’-এ ভূষিত করায় শেখ হাসিনা ভারত সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি, তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করার মাধ্যমে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার একজন যোগ্য নেতা ও গান্ধীজির প্রকৃত অনুসারীকেই সম্মানিত করল।’ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেওয়া ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০২০’ পুরস্কার গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর লোগো উন্মোচন করা হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীর আগামী ২৫ বছর উভয় দেশেরই জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ঐতিহ্যের অংশীদার। আমরা উন্নয়নের অংশীদার। আমরা লক্ষ্যও ভাগাভাগি করি। আমাদের চ্যালেঞ্জগুলোও ভাগাভাগা করি। বাণিজ্য ও শিল্পে আমাদের জন্য একই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি সন্ত্রাসবাদের মতো সমান বিপদও রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে একসঙ্গে এগিয়ে যাবে। দুই দেশের মানুষ ও তাদের ভবিষ্যতের জন্য, দারিদ্র্য ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দুই দেশের প্রচেষ্টাও এক হওয়া উচিত।’
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আজ ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদার করছে। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানাই, যিনি সোনার বাংলার স্বপ্নের জন্য প্রাণ উত্সর্গ করেছেন। ভারতীয়দের জন্য এটি গর্বের বিষয় যে, আমরা শেখ মুজিবুর রহমানকে গান্ধী শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করার সুযোগ পেয়েছি।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আজ বাংলাদেশের সেইসব সন্তানকে স্মরণ করছি, যারা সোনার বাংলার জন্য অগণিত অত্যাচার সহ্য করেছেন, রক্ত দিয়েছেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। আজ আমি স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনাদের। আজ আমি স্মরণ করছি শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, শিক্ষাবিদ রফিকউদ্দিন আহমেদ, ভাষাশহিদ সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার এবং শফিউরকে। আজ আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের ভাই-বোনদের পাশে থাকা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেই সাহসী সৈন্যদেরও প্রণাম জানাই, যারা মুক্তিযুদ্ধে রক্ত দিয়েছিলেন, আত্মত্যাগ করেছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে খুব বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ, জেনারেল অরোরা, জেনারেল জ্যাকব, ল্যান্সনায়েক অ্যালবার্ট এক্কা, গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং, ক্যাপ্টেন মোহন নারায়ণ রাও সামন্তসহ এমন অনেক বীর রয়েছেন, যাদের নেতৃত্ব ও সাহসের কাহিনি আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অংশ নেওয়া আমার জীবনের প্রথম আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি ছিল। আমার বয়স তখন ২০-২২ বছর ছিল, যখন আমি ও আমার অনেক সহকর্মী বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য সত্যাগ্রহ করেছিলাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থন করায় আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম এবং কারাগারেও গিয়েছিলাম।’
নরেন্দ্র মোদি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি ভারতের প্রতিটি কোনা থেকে, প্রতিটি দল থেকে সমর্থন মিলেছিল। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়াস ও মাহাত্ম্যপূর্ণ ভূমিকা সর্বজনবিদিত।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ অগ্রযাত্রা এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সমান জরুরি। আমরা প্রমাণ করেছি যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা থাকলে সকল সমস্যারই সমাধান করা যায়। আমাদের স্থলসীমান্ত চুক্তি এর সাক্ষী। তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০ বছর উদ্যাপন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের ৫০ তরুণ উদ্যোক্তাকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানাতে চাই। তারা ভারতে আসুন, আমাদের স্টার্ট-আপ আর ইকোসিস্টেম উদ্ভাবনে যোগ দিন, পুঁজিপতি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দেখা করুন। আমরাও তাদের কাছ থেকে শিখব, তারাও শেখার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি, আমি বাংলাদেশি যুবকদের জন্য সুবর্ণজয়ন্তী বৃত্তি ঘোষণা করছি।’
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘ভারত এবং বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে একসাথে অগ্রগতি করবে। আমি আবারও আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই। আপনারা আমার প্রতি যে হূদ্যতা দেখিয়েছেন, ভারতের প্রতি এই ভ্রাতৃত্ব, আপনাদের আন্তরিকতা আমি প্রতিটি ভারতীয়র কাছে পৌঁছে দেব! ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চিরঞ্জীবী হবে। এই শুভকামনা জানিয়ে আমি আমার বক্তব্যের ইতি টানছি। জয় বাংলা! জয় হিন্দ!’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্বে বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর পরিবেশনায় বঙ্গবন্ধুকে উত্সর্গ করে নবনির্মিত রাগ ‘মৈত্রী’ পরিবেশনা, ‘পিতা দিয়েছে স্বাধীন স্বদেশ, কন্যা দিয়েছে আলো’ শীর্ষক থিমেটিক কোরিওগ্রাফি, ‘বিন্দু থেকে সিন্ধু’ শীর্ষক তিনটি কালজয়ী গান, ঢাক-ঢোলের সমবেত বাদ্য ও কোরিওগ্রাফি সহযোগে ‘বাংলাদেশের গর্জন : আজ শুনুক পুরো বিশ্ব’ এবং সবশেষে ফায়ার ওয়ার্কস ও লেজার শোর প্রদর্শন করা হয়।
