মানুষের তৈরি বিশ্বের ব্যস্ততম খাল সুয়েজ খাল। উত্তরে ভূমধ্যসাগর থেকে দক্ষিণে লোহিত সাগরের সংযোগরক্ষাকারী খাল। জলপথে ইউরোপ থেকে এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ব্যবস্থা সহজতর করে তুলেছে এই খাল। সম্প্রতি ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী এই রাস্তাটি অবরুদ্ধ হয়ে ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। একটি কনটেইনারবাহী বড় জাহাজ আড়াআড়িভাবে সুয়েজ খালকে বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ২০০-র বেশি জাহাজ এর পেছনে আটকা পড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বিশ্বে পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
মার্কিন প্রভাবশালী মিডিয়া সিএনএন জানিয়েছে, ৪০০ মিটার লম্বা মালবাহী জাহাজ এমভি এভার গিভেনের কারণেই পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়নি। গত কিছুদিন ধরেই সুয়েজ খাল দিয়ে পণ্য পরিবহন সীমিত হয়ে পড়েছে। সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকালে পানামায় রেজিস্ট্রিকৃত জাহাজটি প্রবল বাতাস ও ধূলিঝড়ের সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘুরে গিয়ে খালটির দক্ষিণাংশের সংকীর্ণ একক লেনে আড়াআড়িভাবে আটকে যায়। এতে জলপথটিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ২ লাখ ২০ হাজার টন ধারণক্ষমতার এভার গিভেন তখন উত্তর দিকে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাচ্ছিল। এখন এটি উত্তর-দক্ষিণ উভয়মুখী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপকে সংযোগকারী বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম জাহাজ চলাচল পথকে অকেজো করে রেখেছে। বিশ্বের পশ্চিম ও পূর্বের মধ্যে সংযোগকারী এই খালে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় পণ্যের দাম বেড়ে যাবে যাতে মধ্যবিত্তের পকেট কাটা যেতে পারে। এশিয়া থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ভোগ্যপণ্য সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে কৃষিপণ্য যেতে পারছে না এশিয়ায়। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সুয়েজ খালে ২৩৭টি জাহাজ আটকা পড়েছে যার মধ্যে তেল ট্যাংকার ও কনটেইনারবাহী জাহাজও রয়েছে। এই খাল দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের ১২ শতাংশ পণ্য পরিবহন করা হয়।
বিশ্বের অন্যতম বড় লজিস্টিক ফার্ম সি.এইচ. রবিনসনের সিইও ববি বিস্টারফেল্ড বলেন, ‘সরবরাহ চেইনে এত বড় সংকট আমি কখনো দেখিনি। সুয়েজ খালের পরিস্থিতি আকাশ, সমুদ্রপথ ও স্থলপথকেও সংকটে ফেলেছে এবং প্রতিদিনই বাড়ছে। সতিই এটা অপ্রত্যাশিত।’
পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
বিশ্বের বাণিজ্যের ৮০ শতাংশই সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। সুয়েজ খালে এই জাহাজ আটকা পড়ায় কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি হবে। এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল প্ল্যাটসের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের পহেলা মার্চ পর্যন্ত ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি জাহাজে পণ্য পরিবহনে খরচ হয় গড়ে ১ হাজার ৪০ ডলার থেকে ৪ হাজার ৫৭০ ডলার। আরেক হিসাবে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিবর্ন পণ্য পরিবহনে খরচ পড়েছিল ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই খরচ ছিল ২ বিলিয়ন ডলার। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, নেদারল্যান্ডসের বোসকালিস কোম্পানি জাহাজটিকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে। এ কাজ করতে কত সময় লাগবে তা বলার সময় এখনো হয়নি বলে বোসকালিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিটার বেরদোওস্কি জানিয়েছেন। ডাচ টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘নিউসুয়ার’ এ তিনি বলেছেন, এটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে, কয়েক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। জাহাজের সামনের অংশ ও পেছনের অংশ খালের দুই পাড়ের ওপরে উঠে আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
