ভারতের প্রধানমন্¿ী নরেন্দ্র মোদির ঢাকায় আগমনের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের সমর্থক মাদ্রাসা ছাত্ররা গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস বিক্ষোভ করেছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কমপক্ষে পাঁচ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় জুমার নামাজের পর পুলিশ-বিক্ষোভকারী সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ ৪০ জন আহত হয়েছে। চট্টগ্রামে মাদ্রাসা ছাত্রদের মিছিল থেকে হাটহাজারী থানায় হামলা চালানো হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় ভূমি অফিস ও ডাকবাংলোয় ব্যাপক ভাঙচুর চালায় বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ বাধা দিলে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় চারজন মারা যায় ও পুলিশসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভকারীরা। এতে সিলেট ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সব ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের গ্যারেজে থাকা একটি গাড়িতেও আগুন দেয়। এখানে সংঘর্ষে পুলিশসহ ২০ জন আহত হয়। আহত এক তরুণ পরে জেলা সদর হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে আমাদের চট্টগ্রাম অফিস ও হাটহাজারী সংবাদদাতা জানান, দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার ছাত্ররা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কে মিছিল বের করে। মিছিল থেকে নিক্ষেপ করা ইটে হাটহাজারী থানা ভবনের দরজা-জানালার কাচ ভেঙে যায়, আসবাবপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পুলিশ তাদের প্রতিরোধ করতে গেলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পুলিশ কয়েকটি গুলি করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় আট থেকে দশজন গুরুতর আহত হয়। তাদেরকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চারজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এরা হলেন রবিউল ইসলাম, মেহরাজ, জামিল ও আবদুল্লাহ। এদের মধ্যে রবিউল, মেহরাজ ও জামিল হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার ছাত্র এবং আবদুল্লাহ এলাকায় দর্জির কাজ করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। চার জনের মৃত্যুর খবরে বিক্ষুব্ধ স্বজনরা চট্টগ্রাম মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর চালান। ঘটনার পর মাদ্রাসার বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নিহত চার জনকে নিজেদের কর্মী দাবি করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী।
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন ইত্তেফাককে জানান, জুমার নামাজের পর মিছিল নিয়ে থানা, ভূমি অফিস ও ডাকবাংলোয় হামলা করে হেফাজতের নেতাকর্মীরা। তারা ভূমি অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও আসবাবপত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তারা একটি গাড়িতেও আগুন দেয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, দুপুর আড়াইটার দিকে শহরের প্রধান সড়ক টিএ রোডে মাদ্রাসার ছাত্ররা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তারা সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। শহরের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধরা মিছিল নিয়ে গিয়ে রেল স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা স্টেশনের সিগন্যাল রুম, মাস্টার রুম, কন্ট্রোল রুমসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর করে। সমস্ত মালামাল একত্রিত করে আগুন ধরিয়ে দেয়। রেললাইনের স্লিপার তুলে ফেলে বিক্ষুব্ধরা। সিগন্যাল বক্স ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফলে ঢাকার সঙ্গে সিলেট ও চট্টগ্রামের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।
পরে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে ব্যাপক হামলা চালানো হয়। সড়কে আগুন ধরিয়ে রাস্তায় অবরোধ করা হয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়। এক সময় বিক্ষুব্ধরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা জজের বাসভবনের মূলফটকে হামলা চালায়। বিক্ষুব্ধরা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে গ্যারেজে থাকা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিকালের দিকে শহরের কাউতলী এলাকার দাতিয়ারা গ্রামের সাগর মিয়ার ছেলে আশিককে (২৫) গুরুতর আহত অবস্থায় জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। পরে বিক্ষুব্ধরা লাশ নিয়ে শহরে বিক্ষোভ করে।
পটিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের পটিয়ায় আল জামেয়া আল ইসলামিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল থেকে পটিয়া থানায় হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ থানার মূল ফটক বন্ধ করে দেয়। তবে কোনো ধরনের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
বায়তুল মোকাররম এলাকায় সংঘর্ষ
ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, জুমার নামাজের পর বিক্ষোভকারীরা বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে মিছিল শুরু করে। পরে পুলিশ তাদের ওপর রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে, এছাড়াও ব্যবহার করে জল কামান। মিছিলকারীদের দমাতে পুলিশের সঙ্গে যোগ দেন আওয়ামী লীগের কর্মীরাও। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার সময় বায়তুল মোকাররমের সামনে কয়েকটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থান নেওয়া অনেকের হাতে লাঠি দেখা গেছে। তারা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে জুতা, ইটপাটকেল ছুড়ে মারে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক (ওসি) বাচ্চু মিয়া জানিয়েছেন, বায়তুল মোকাররম এলাকায় সংঘর্ষে আহতদের অন্তত ৪০ জন ঢাকা মেডিক্যালে চিকিত্সা নিয়েছেন।
