বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে মোদির শ্রদ্ধা

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২১, ২২:৫৬

অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালির যে দীর্ঘ ত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনকে তারই প্রতিচিত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল শনিবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে জাতির পিতার সমাধিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর নরেন্দ্র মোদি দর্শনার্থী বইয়ে এভাবেই বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেছেন।

নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, ‘অধিকার, নিজস্ব সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের জন্য বাংলাদেশের মানুষের যে সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধুর জীবন তারই প্রতিচিত্র। তার অবিনাশী চেতনা আর অদম্য সাহস কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে, বহু বাধাবিপত্তি পেরিয়ে তারা পরিণত হয়েছে বিজয়ী জাতিতে।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দুই দিনের সফরে শুক্রবার ঢাকায় আসেন নরেন্দ্র মোদি। সফরের দ্বিতীয় দিন শনিবার সাতক্ষীরার শ্যামনগরে যশোরেশ্বরী কালীমন্দির পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে তিনি টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফুল দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে স্বাগত জানান। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার উপস্থিতিতে দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করে নরেন্দ্র মোদি সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন এবং একটি গাছের চারা রোপণ করেন।

দর্শনার্থী বইয়ে নরেন্দ্র মোদি লেখেন, ‘ভারতবাসী বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে একজন বীর হিসেবে, সেই ভারতবাসীর পক্ষে আমি ২০ শতকের এই মহান রাষ্ট্রনেতার প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম, যে ইতিহাসকে তিনি নতুন রূপ দিয়েছেন দৃঢ়সংকল্প আর আত্মত্যাগের প্রবল শক্তি দিয়ে।’ আরো লিখেছেন, ‘এই ঐতিহাসিক মুজিববর্ষে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুর দিয়ে যাওয়া সাম্য, মুক্তি আর ন্যায়বিচারের চেতনা আমাদের ভবিষ্যতেও পথ দেখিয়ে যাবে।’

বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বেলা সাড়ে ১২টার দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর ওড়াকান্দিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ওড়াকান্দি মন্দিরে পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি মতুয়াবাদের প্রবক্তা হরিচাঁদ ঠাকুর ও তার ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পূজা দেন। পরে মতুয়া প্রতিনিধিদের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।

সমাবেশে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ নিজেদের বিকাশ ও প্রগতির চেয়ে সমগ্র বিশ্বের উন্নতি দেখতে চায়। বিশ্বে অস্থিরতা, আতঙ্ক, সন্ত্রাস ও অশান্তির পরিবর্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দেখতে চায় উভয় দেশ। এই শিক্ষাই শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর আমাদের দিয়েছেন। আজ সমগ্র বিশ্ব যে মূল্যবোধের কথা বলে, মানবতার যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, সেই মূল্যবোধের জন্য হরিচাঁদজি নিজের জীবন উত্সর্গ করেছেন।’

নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের সামনে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, দুই দেশের একজোট হয়ে প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা উচিত।’ বাংলাদেশকে বিশ্বে বিকাশ ও পরিবর্তনের শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত আজ সবার সঙ্গে, সবার বিকাশ এবং সবার বিশ্বাস—এই মন্ত্র নিয়ে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ এতে সহযাত্রী। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সামনে বিকাশ আর পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী উদাহরণ পেশ করছে। সেই প্রচেষ্টায় ভারত আপনাদের সহযাত্রী। আমার বিশ্বাস আছে, শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের আশীর্বাদে গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রেরণায় আমরা দুই দেশে একবিংশ শতকের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করব। ভারত ও বাংলাদেশ উন্নতি ও প্রেমের পথে বিশ্বে পথপ্রদর্শন করতে থাকবে।’

পশ্চিম বাংলায় ঠাকুরনগর সফরে মতুয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগর থেকে বাংলাদেশের ঠাকুরবাড়ী পর্যন্ত একই রকমের শ্রদ্ধা রয়েছে। একই রকমের আস্থা রয়েছে। একই রকমের অনুভূতি রয়েছে।’ নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আজ সব ভারতবাসীর সৌভাগ্য যে তারা এখানে বাংলাদেশে শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। ওড়াকান্দিতে শিক্ষার অভিযানে এখন থেকে ভারতের জনগণও যুক্ত হবে, ওড়াকান্দিতে মেয়েদের মিডল স্কুল আপগ্রেড করবে, নতুন নতুন সুবিধা প্রদান করবে। ভারত সরকার এখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করবে। এটি ভারতের কোটি কোটি জনগণের পক্ষ থেকে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে শতবর্ষের পুরাতন যশোরেশ্বরী কালীমন্দির পরিদর্শন করেছেন। গতকাল শনিবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তিনি মন্দিরে প্রবেশ করেন এবং ১০টা ২২ মিনিটে দেবী কালীর নামে পুরাতন এই যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজা-অর্চনা সম্পন্ন করেন। এ সময় পুরোহিত দিলীপ মুখার্জি তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করছিলেন। নরেন্দ্র মোদি কালীমাতাকে সোনার মুকুট, লালগুজরাটি শাড়ি, ফল ও মিষ্টি নিবেদন করেন। তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে ভক্তদের সঙ্গে ফটোসেশন করেন। এরপর তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে সাতক্ষীরা ত্যাগ করেন।