বছর পনেরো বা কুড়ি আগের কথা। মিরপুরের সুন্দর ছিমছাম এক তিনতলা বাড়ি। বাড়ির নিচতলায় গাড়ির গ্যারেজ। গ্যারেজের এক পাশে অদ্ভুত এক ঘর। ঘরখানা সম্ভবত চার হাত বাই চার হাত মাপের। সেই ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকতে গেলে থমকে যেতে হয়।
কারণ, দরজার ভেতর পা রাখতেই একখানা চৌকি। চৌকিখানার সাইজ কত কে জানে! কম করে হলেও সাড়ে তিন হাত তো হবেই। তবে চার হাত ঘরে এই সাড়ে তিন হাত চৌকি কী করে ঢুকল, সে এক রহস্য বটে! চৌকির নিচে পুরোনো পত্রিকা বিছানো। পত্রিকার ওপর পেঁয়াজ, রসুন, শুকিয়ে যাওয়া কাঁচা মরিচ, ক’খানা আলু। একটা ছোট্ট তেলের বোতল। মুখ ছেঁড়া নুনের প্যাকেট। খানিক মসুর ডাল। আর চাল। একখানা কেরোসিনের স্টোভও।
এই ঘরে আমার বাবা থাকেন। এই তার একার সংসার। তিনি এই বাড়ির পাশেই খুব ছোট্ট একটা চাকরি করেন। ঢাকা শহরে থাকার যা খরচ! সেই খরচ বাঁচাতেই তিনি এই বাড়ির দারোয়ানের ঘরখানা শেয়ার করে থাকছেন। বিনিময়ে মাসে সামান্য কিছু ভাড়া।
আমার খুব ঢাকায় আসার ইচ্ছে। আব্বা প্রতিবার বাড়ি গেলে আমি কাঁদি, ‘আব্বা, ঢাকা যামু, ঢাকা যামু, ঢাকা যামু।’
আব্বা আমাকে ঢাকা আনেন না। আম্মাকেও না। কেন আনেন না?
কে জানে! হয়তো তিনি দেখাতে চান না, এই ঢাকায় তিনি কোথায় থাকেন, কেমন করে থাকেন, কী অবস্থায় থাকেন!
কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা! সেই নাছোড়বান্দা আমাকে একবার ঢাকা নিয়ে এলেন আব্বা। এনে রাখলেন তার সেই খুপরি ঘরে। সেখানে শুলে পা টান হয় না। ঘুমের ভেতর বাঁ থেকে ডানে মোড় নেওয়া যায় না। দম আটকে আসে। আমার ঘুম হয় না। আমি সারা রাত চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে থাকি। আর ভাবি, ‘টিভিতে তো কী সোন্দর সোন্দর বাড়ি দেখছি ঢাকার। কিন্তু এইটা কী বাড়ি আব্বার? কী ঘর?’
আব্বা আমার ভাবনা বুঝতে পারেন কি না জানি না। তবে তিনি আমার পিঠে হাত দিয়ে বলেন, ‘বাবু, কষ্ট হইতেছে?’
আমি ঘুমের ভান ধরে চুপ করে থাকি। আব্বা আমার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, ‘কাইল সারা দিন আর এই ঘরে থাকন লাগবো না। আমরা বাপ-ব্যাটা মিল্যা ঢাকা শহর ঘুইরা দেখব। কী সোন্দর ঢাকা শহর। এইখানের মতন দমবন্ধ লাগব না আব্বু। মন খারাপ কইরো না, তোমার আব্বায় গরিব মানুষ। কিন্তু তোমরা কিন্তু গরিব না আব্বু...’
আমি কথা বলি না। চুপ করে থাকি। আব্বা কী ভাবছেন? আমি ঘুমিয়ে গেছি? কী জানি! আমি ধরা দেই না। ঘুমের ভান ধরে থাকি। আব্বাও কি কোনো ভান ধরে থাকেন? কে জানে! আমি জানি না।
পরদিন ভোরে আব্বা আমাকে নিয়ে বের হন। আমরা ঢাকার রাস্তাঘাটে প্রজাপতির মতন উড়ে বেড়াই। পাখির মতন কলকাকলিতে মুখরিত হই,
‘আব্বা এইটা কী?’
‘এইটা সংসদ ভবন।’
‘এইটা?’
‘এইখানে সাঁতার হয়।’
‘সাঁতার হয় এইখানে? কেমনে? এইখানে কি নদী আছে? খাল আছে? পুস্কুনি আছে?’
আব্বা হাসেন। বলেন, ‘এইটার মধ্যে পুস্কুনির মতন আছে।’
আমি রাজ্যের অবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, এই ঘরের মইধ্যে পুস্কুনি! বড়ই আচানক কাণ্ড!
আব্বা আমাকে কত কত কিছু দেখান!
কিন্তু বই? আমার তো বই পড়ার নেশা। বই কই পাব? শুনেছি ঢাকায় রাস্তায় রাস্তায় বই বিক্রি হয়? আব্বা আমাকে নিয়ে গেলেন পাবলিক লাইব্রেরি। কিন্তু কখনো ঢোকেননি বলেই হয়তো ভেতরে ঢুকতে সাহস পাননি। দরজা অবধি গিয়েও ফিরে এলেন।
আমাকে নিয়ে গেলেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের কাছে। সেটি দেখিয়ে বললেন, ‘জাতীয় কবি। বড় লেখক।’
আমি অবশ্য তখন তাকিয়ে আছি ফুটপাতে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা বই বিক্রেতার বইয়ের দিকে। বলি, ‘আব্বা বই?’
আব্বা আমাকে সেই বইয়ের কাছে দাঁড় করান। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। কিন্তু আব্বাকে কিনে দিতে বলতে সাহস পাই না। যদি আব্বার কাছে টাকা না থাকে! আব্বা আমাকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসেন রাজু ভাস্কর্যের সামনে, অপরাজেয় বাংলার সামনে, তারপর বাংলা একাডেমি দেখিয়ে বলেন এইখানে বইমেলা হয়!
আমি অবাক হয়ে যাই, বইয়েরও আবার মেলা? এত দিন গ্রামে দেখেছি বৈশাখী মেলা, পুজার মেলা, তাতে কত কী পাওয়া যায়, আস্ত খাট থেকে শুরু করে পাতার বাঁশি অবধি। আর এই মেলায়? কেবল বই?
আব্বা বলেন, ‘হ্যাঁ। বই।’
আমি আব্বার দিকে তাকিয়ে বলি, ‘আব্বা একদিন আমারে বই মেলায় নিয়াসবেন?’
আব্বা কেন যেন কথা বলেন না। কে জানে কেন? তবে হাসেন। সেই হাসির অর্থ আমি বুঝি না। জানি না।
তবে আজকাল প্রতিবার যখন বইমেলায় গিয়ে নিজের বইগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেই। এই যে আজও যাব। আমার লেখা স্মৃতিগন্ধা, তোমার নামে সন্ধ্যা নামেসহ কত কত বই মেলায়! গিয়ে দেখব সেসব বই নিয়ে পাঠকের তুমুল উচ্ছ্বাস, দেখিও। বইয়ের ঘ্রাণ নিতে নিতে মেলায় অটোগ্রাফ দিই, সেই প্রতিটি মুহূর্ত আমার আব্বার সেই হাসির কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, আব্বা গ্রামের বাড়িতে বসে এখনো হাসছেন। তিনি ঢাকায় একদমই থাকতে পারেন না। দমবন্ধ হয়ে আসে। স্ট্রোক করার পর থেকে শরীরের ডান দিকটায় তেমন সাড়াও পান না। ফলে ভিড়ভাট্টায় হাঁটাচলা করতে পারেন না বলে আসতে চান না মেলায়ও। কিন্তু আমি তো জানি, তিনি মেলাতেই থাকেন। আমার প্রতিটি পদক্ষেপে, অনুভবে, স্পর্শে আর পাঠকের সীমাহীন ভালোবাসায় তিনি থাকেন। থাকেনই।
ইত্তেফাক/এসজেড
