বাঙালির যত আন্দোলন-সংগ্রাম ও ইতিহাস-ঐতিহ্য, তা সৃষ্টি হয়েছে সাংস্কৃতিক জাগরণের মধ্য দিয়েই। বইমেলা সাংস্কৃতিক জাগরণে অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ভাষা আন্দোলনে অমর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভাষা সংস্কৃতির প্রতি আবেগ এবং অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক উদার চেতনাসমৃদ্ধ হয়ে একুশে বইমেলা রূপ নিয়েছে বাঙালির সর্বজনীন উত্সবে।
এখানে শুধু ক্রেতা-বিক্রেতা-পাঠকেরই সমাগম হয় না, মেলা পরিণত হয় লেখক-প্রকাশক-পাঠক-দর্শকসহ বয়স-শ্রেণিনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলায়। সৃজনশীল প্রকাশকেরা হাজারো বইয়ের পসরা নিয়ে হাজির হন বইমেলায়। মেলায় আগত দর্শকসমাগম নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে সারা দেশের অগণিত গ্রন্থপিপাসুর নতুন বই হাতে পাওয়ার বিপুল আকাঙ্ক্ষাকে।
বইমেলায় আসেন লেখকেরা, বিশেষত তরুণ-তরুণীরা, কিশোর-কিশোরীরা, ছাত্রছাত্রীরা আর আসেন মধ্যবিত্ত। তারাই মেলার প্রধান ক্রেতা। জনপ্রিয় ও পাঠকনন্দিত লেখকের বই ছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত আমলা, প্রবাসী বাঙালি কিংবা নবীন লেখকের কাঁপা হাতের প্রথম লেখাটিও ফেব্রুয়ারির বইমেলায় প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে। একুশের মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনাই হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। এটা প্রকাশনাশিল্প, লেখক-পাঠক কারো জন্যই শুভকর নয়। সারা বছর ধরে বইয়ের প্রবাহ ঠিক রাখতে হলে এই মেলাকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
পেশাদার প্রকাশক ছাড়াও অপেশাদার প্রকাশকেরাও মেলা উপলক্ষ্যে বই প্রকাশ করেন। এর ভালোমন্দ দুই দিকই রয়েছে। অনেকে লেখক হওয়ার বাসনায় গাঁটের পয়সা খরচ করে নিজ উদ্যোগে বই বের করেন। এতে মেলায় বইয়ের সংখ্যা বাড়লেও সেই হারে মান বাড়ছে না। যেনতেনভাবে নতুন বই মেলায় আনার প্রবণতার ফলে মানহীন বই, ভুল বানান, তথ্য ও মুদ্রণত্রুটিযুক্ত বইয়ে বাজার ভরে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে তা প্রকাশনাশিল্প, লেখক, ক্রেতা, পাঠক—সবার জন্যই ক্ষতিকর। এ জন্য সারা বছরই বইয়ের প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে হবে। এতে মেলার সময় বই প্রকাশের বাড়তি চাপ থেকে লেখক, প্রকাশক সবাই মুক্ত থাকতে পারবেন। তখন প্রকাশনার প্রতি যথাযথ মনোযোগ ও যত্নশীল হওয়ার অবকাশ সৃষ্টি হবে। আর একটি বিষয় হচ্ছে, বইমেলায় যত বই প্রকাশিত হয়, সে তুলনায় বিক্রি হয় না। যদিও প্রতি বছর মেলায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয় বলে প্রকাশকেরা বলে থাকেন।
বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় লেখক হুমায়ুন আজাদের কথায়—‘বই পড়া যায় না, নিজেকে পড়তে হয়, মনোযোগ দিতে হয়, বুঝতে হয়, জ্ঞান বা শিল্পকলার প্রতি আকর্ষণ থাকতে হয়; এবং বই পড়ে হাতে হাতে নগদ আমরা কিছু পাই না। একটা ফাইল চাপা দিয়ে এক লাখ টাকা রুজি করতে পারি; যদি মন্ত্রী হই, তাহলে স্ত্রীর নামে পঞ্চাশ কোটি টাকার জমি পাঁচ হাজার টাকায় নিতে পারি; এমনকি একটি পোক্ত ক্যাডার হলেও দিনে দশ হাজার অর্জন করতে পারি। আমাদের রাষ্ট্র যারা চালায়—মন্ত্রী, আমলা, বিচারপতি, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সেনাপতি এবং অন্যরা বই পড়ে না; কেননা, তাতে কোনো আশু লাভ নেই, বরং পড়া বেশ কষ্টকর কাজ; আর শিল্পকলা ও জ্ঞানে গুলশান-বারিধারায় প্রাসাদ ওঠে না।’ কিন্তু এই বন্ধ্যত্ব আর কত দিন?
আমাদের পাঠাভ্যাস বাড়ানোর পাশাপাশি বই কেনার অভ্যাসও করতে হবে। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কেনা’র সেই দম্পতির মতো আমাদের ‘একখানা বই হলেই চলে’—এই মনোভাব পরিহার করতে হবে। সব সময়ের জন্য সেরা পুরস্কার হচ্ছে বই। প্রিয়-অপ্রিয় সবাইকে বই উপহার দিন। বইকেন্দ্রিক একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলুন।
মনে রাখতে হবে, সৃজনশীল, প্রগতিবাদী, অসাম্প্রদায়িক মানুষ প্রথাবিরোধী লেখকদের এদের পরম শত্রু। এ কারণেই সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বইমেলা হতে পারে এক বিরাট প্রতিবাদ। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায়ও বইমেলার অবদান কম নয়।
আবারও হুমায়ুন আজাদের শরণ নিতে হয়। একটি লেখায় তিনি বলেছেন, ‘একজন তরুণ বা তরুণী যখন একটি বই কিনে জ্বলজ্বল করে ওঠে, তখন আমি তাদের চোখেমুখে অসংখ্য শুকতারা ঝলমল করতে দেখি।’
সত্যি, এই ঝলমলে তারুণ্যই তো পালটে দিতে পারে সবকিছু। ইন্টারনেট, ফেসবুক আর মুঠোফোনের মায়াজালের মধ্যেও নানা রঙের আনকোরা প্রচ্ছদে ছাপা নতুন বইয়ের ম-ম গন্ধে কি মাতাল হবে না তারুণ্য? সার্থক করবে না মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী কিংবা শহিদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকে?
লেখক: সাংবাদিক
