২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাঙালি জাতির স্বাধীনতার উত্থান ১৯৭১ সালের ২ মার্চ থেকেই শুরু হয়েছিল। এই ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র-জনতার সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৩ মার্চ ‘স্বাধীন বাংলাদেশের ইশতেহার পাঠ’, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এছাড়া ২ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলায়) অসহযোগ আন্দোলন করা হয় তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে। ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে’ পাকিস্তানের পতাকার স্থলে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাঙালি জাতির স্বাধীনতার উত্থান কেবল ২৬শে মার্চ কেন্দ্রিক নয়। ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা ঘোষণার আনুষ্ঠানিক প্রকাশের একটি মুহূর্ত। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ইংরেজিতে দিয়েছিলেন যাতে বিশ্ববাসীও ঘোষণাটি বুঝতে পারেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে যেন আমাদের সাহায্য করেন। এই ঘোষণাটি বাংলাদেশের সব স্থানে ট্রান্সমিটার, টেলিগ্রাম, টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়।
আমাদের আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ইতিহাসবিমুখ এবং রাজনৈতিক সচেতনতার অভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে এসেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নীতি, নৈতিকতা ও আদর্শ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয় নি। আমাদের ইতিহাসবিমুখ এসব প্রজন্ম শুধু ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত জানাশোনা খুবই কম। এদের অনেকেই জানে না, ২ মার্চ কী হয়েছিল? ৩ মার্চ কী হয়েছিল? অসহযোগ আন্দোলন কেনো হলো? ৭ই মার্চ ভাষণের মূল উপজীব্য কী ছিল? কিংবা অপারেশন সার্চলাইট কী? গেরিলাযোদ্ধা মানে কী? মুক্তিযুদ্ধে কয়টা সেক্টর ছিল? বীরশ্রেষ্ঠ কারা কারা ছিল? বীর-উত্তম, বীরবিক্রম—এগুলো মানে কী? মুক্তিযুদ্ধে পাশের দেশ ভারতের কিংবা বহির্বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের ভূমিকা কী ছিল?
এসব প্রশ্ন নতুন প্রজন্মকে করলে, তখন তারা নজিরবিহীন নীরবতা পালন করে। ক্ষমতাসীন দল কিংবা বিরোধীদলের ছাত্র নেতাকর্মীদেরও অনেকের এসব সম্পর্কে অবিশ্বাস্য রকমের অজ্ঞাত। জয় বাংলা এবং বাংলাদেশ জিন্দাবাদ—এসব মুখস্ত বুলি আওড়ায় এবং জাবর কাটতে থাকে।
২৬শে মার্চ উপলক্ষ্যে দেশের অনেক জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনাসভা অন্ধ প্রজন্মের চোখে আলো ফুটাতে সাহায্য করবে। এজন্য এসব কর্মসূচিকে সাধুবাদ জানাই; কিন্তু একই সঙ্গে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে যেসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয় সেগুলোর কোনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা বাঙালিয়ানা ব্যাপারগুলো প্রদর্শিত হয় না। বিদেশি সংস্কৃতির গান, নাচ, ডিজে পার্টির অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। এসব প্রোগ্রামে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, দেশের গান, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবিতা আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নাটিকা—এগুলোর কোনো কিছুই স্থান পায় না এই সব রঙ্গমঞ্চে। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে থাকে বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে ৯ মাস যুদ্ধ করে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। এই স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। আমাদের দেশ, আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার চেতনা যাতে ভূলুণ্ঠিত না হয়, সেদিকে আমাদের সর্বোচ্চ সুবিবেচক হতে হবে। একটি সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সবার সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং প্রচেষ্টা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
